19/08/2017

মাতৃত্ব যুদ্ধরত "মা"

কালের কলম ।। আরিফুল ইসলামঃ




"যে সাদা বাহু, কোমল দেহ, মধুময় বুক ও  চন্দ্রিমা মুখ আপনাকে প্রগাঢ় উষ্ণতায় আচ্ছন্ন করে রাখে, তা কি আপনার জৈবিক চাহিদার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে?" 


বস্তির রাত, প্রায় ৩টা। ছিটেফোটা বৃষ্টির আনাগোনা। চারিদিকে অমবস্যার অন্ধকার। মেঘের স্বর্ণালি লাইম লাইট। চলছে, আমার মায়ের মাতৃত্ব লাভের যুদ্ধ। কি সে মলিন এক দুঃসহ তৈল চিত্র! 
নির্ভার বাহু, নিলাভ দেহ, কষ্টময় বুক ও ব্যাথাময় চন্দ্রিমা মুখ। চর্তুরপাশ সন্তান জন্মদানের আর্ত চিৎকার। 

কোন কিছু না বুঝেই আশেপাশে জড়ো হয়েছে অনেকেই। তবে বেশির ভাগই উৎসুক! সবারই সহযোগীতার গাড়ী আছে। কিন্তু ইচ্ছে নেই। ফলে মায়ের প্রসব বেদনার আর্তনাদ কারো মন গলাতে পারছেনা তখনও।  

এগিয়ে এল পুলিশ। ফিরিয়ে নিল মুখ। বেচারা রিকশাচালক আমার বাবা কিংকর্তব্যবিমুড়। অবশেষে এক নাইট গার্ডই হাত বাড়ালো মাতৃত্ব যুদ্ধরত আমার মায়ের দিকে। দৌড়েগেলেন ধাত্রী আনতে। তখনও আমার বাবা আত্মভোলা। 

হটাৎ করে নতুনত্বের আবির্ভাবের কর্ণচড়া শব্দ। বুঝলাম, এ হেরেমে এসেছে বুঝি, পৌরষ্য গণিমতের মাল বণ্টনের মহানায়ক, "আমার ভাই"। তখন আমি আনন্দে আত্মহারা।    

এমন সময় নাইটগার্ড ধাত্রী নিয়ে হাজির। আহ কি আনন্দ! আমি যে "বড় বোন"। আর আমার বাবা, বেচারা রিকশাচালক মুখ চাওয়া চাওয়িতে ব্যস্ত। কি করবে বুঝতেই পারছে না। তবুও তার মুখে এক চিলতে হাসি। তাঁরও হৃদয়ে যে পিতৃত্বের টান। আহ কি স্বর্গীয় পরিবেশ। 

কিন্তু বিধি বাম! কিছুক্ষণ পরেই যমরুপি ধাত্রী জানালেন; "মাতৃত্ব যুদ্ধে রক্তাত্তপ্রান্তরে রক্তক্ষরণে শহীদ হয়েছেন মাতৃত্ব যুদ্ধরত এক মা"! 

আহ, এই হচ্ছে মা! আমার মা! আমাদের মা! আমাদের পৃথিবী! 

তাই, অনাগত আমিও এক মাতৃত্ব যোদ্ধা মা হয়ে জানতে চাই, আমার মায়ের কাছে। আমার বাবার কাছে আর আমার ভাইয়ের কাছে -  

আচ্ছা, মা-
তুমি কি করে মাল হও?
তুমি কি করে মাগী হও?
তুমি কি করে বেশ্যা হও?
তুমি কি করে খানকি হও?
তুমি কি করেই বা যৌন উত্তেযক হও?   

আচ্ছা, ভাই-
তোমার কি করে ইচ্ছে করে
অনাগত ৪ বছরের ছোট্ট মাকে ধর্ষণ করতে?  
তোমার কি করে ইচ্ছে করে
স্কুল মোড়ে বসে কামনার কুটুক্তি "মাল" বলে ডাকতে?  
তোমার কি করে ইচ্ছে করে
ওড়নার নিচের জীবনদানকারী মাংশল পিণ্ডটার দিকে চোখ দিতে?  

আচ্ছা, বাবা-  
তোমাদের বিশেষ সেই মুহূর্তে একবারও কি আমার মায়েদের সেই নির্ভার বাহু, নিলাভ দেহ, কষ্টময় বুক ও ব্যাথাময় চন্দ্রিমা মুখ আর রক্তাত্তপ্রান্তরে সন্তান জন্মদানের আর্ত-চিৎকার কি কানে ভাসে না? তখনও কি রক্তভেজা পিচ্ছিল গহ্বরটা আপনার জৈবিক চাহিদার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে?      

থামাও ধর্ষণ, বাঁচাও দেশ। 

দেখ তোমার মায়ের বেশ। 

14/08/2017

পারমাণু, এন্টি-পারমাণু ও বিশ্ব শান্তিঃ ৬ / শেষ

কালের কলম ।। আরিফুল ইসলাম

পরমানু হল মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা, যাতে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে। আর পরমানু শক্তি হলঃ যদি পরমানুর গঠনে আঘাত কোরে এর মুল কনিকায় বা উপাদানে বিভক্ত করা যায় তবে সঞ্চিত যে বিপুল শক্তি নির্গত হয় সেই শক্তিকে পারমানবিক শক্তি বলে।

আজ পর্যন্ত অভিশপ্ত বিজ্ঞানের আবিষ্কারের খাতায় ধরা পড়েছে পরমানু মোট দুই (২) প্রকার। আর তা হলঃ U-235 ও U-238। কিন্তু ধ্বংস খেলায় পরমানু অস্ত্রে বাবহারিত হয় U-235। তাছাড়া এ অস্ত্রে আরও বাবহারিত হয় ভারী পানি Ho। পরমানু অস্ত্রে বাবহারিত ধাতু U-235 যার পারমানবিক সংখ্যা 92।

আমরা জানি, মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কনাকে পরমানু বলে। কিন্তু মৌলিক পদার্থ হল সেই পদার্থ যে পদার্থকে ভাঙলে ঐ পদার্থ ছাড়া অন্য কোনও পদার্থ পাওয়া যায়না। যেমনঃ সোনা, রুপা, লোহা, অক্সিজেন, পরমানু ইত্যাদি হল মৌলিক পদার্থ।

আর পৃথিবীতে মোট মৌলিক পদার্থ আছে ১০৯ টি। যার মধ্যে ৯২ টি প্রকিতিতে আর ১৭ টি গবেষণাগারে তৈরি করা যায়। মৌলিক পদার্থের আরও একটি গুন আছে; সেটি হল এরা সাধিন অবস্থায় নিজ ক্ষমতা বা ধর্ম বজায় রাখতে পারে। আর পরমানুতে মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণাগুলো অটুট থাকে সর্ব-অবস্থায়।

চিত্রঃ
এখন আমাদের জানা দরকার পরমানুকে কিভাবে ভাঙ্গা যায়। এবং পরমানু অস্ত্র কিভাবে কাজ করে। কার সাথে কখন বিক্রিয়া করে এবং পরমানু কিভাবে শক্তি ছড়ায়? আসুন আমরা এই সূত্র থেকে জেনে নিইঃ

সূত্রঃ ü*n-b=-nu

“পরমানুর ক্ষুদ্রতম কণা নিউট্রন দ্বারা কোন পরমাণুকে আঘাত করলে পরমানু শক্তি ছড়ায় এবং ক্যাডমিয়াম বা বোরন দণ্ড দ্বারা উৎপন্ন নিউট্রনকে শোষন করলে পরমাণু দুর্বল হয়ে তাঁর উৎপন্ন শক্তি হারিয়ে ফেলে”

প্রমানঃ
ভারী পরমানু সম্পন্ন একটি ইউরোনিয়ামকে নিউট্রন দ্বারা আঘাত করলাম এখন পরমাণুটি ভেঙ্গে দুই টুকরো হয়ে গেলো এবং তিনটি নিউট্রন ও বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হল।

চিত্রঃ
আবার, প্রথম আঘাতে উৎপন্ন তিনটি নিউট্রন আরও তিনটি পরমানু শক্তিকে আঘাত করলে নয়টি নিউট্রন এবং তিনগুন পরমানু শক্তি নির্গত হল। আবার উৎপন্ন নয়টি নিউট্রন নয়টি পরমানুকে আঘাত করবে ফলে সাতাশটি নিউট্রন ও সাতাশগুন শক্তি উৎপন্ন হবে। এভাবে একটি শৃঙ্খলার মাধ্যমে দ্রুতগতিতে বিক্রিয়াটি চলতে থাকবে একটি আবদ্ধ শক্তির মধ্যে।
এখন কথা হল কিভাবে পরমাণু অস্ত্র কাজ করে?

পারমানবিক অস্ত্র সমুহ মূলত দুই ধরনের, ফিশান ও ফিউশন টাইপ। ফিউশন শব্দের অর্থ গলন। অর্থাৎ, দুটি হালকা ভরের ডিউটেরিয়াম বা ট্রিটিয়াম (হাইড্রোজেনের আইসোটোপ) পরমানুর দ্রুত গতিতে মিথস্ক্রিয়ার ফলে তুলনামুলক একটি ভারী পরমানু (হিলিয়াম) ও বিপুল পরিমানে শক্তি উৎপন্ন হয়, একে ফিউশন বিক্রিয়া বলা হয়। আমাদের অতি পরিচিত সূর্য এর উৎকৃষ্ট উদাহরন, যেখানে অনবরত ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম থেকে হিলিয়াম ও শক্তি উৎপন্ন হয়। এই ফিউশন বিক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে যে অস্ত্র উৎপন্ন করা হয় তাকে বলা হয় থার্মোনিউক্লিয়ার বম্ব, যা হাইড্রোজেন বম্ব(H-Bomb) হিসেবে সুপরিচিত। ১৯৫২ সালে হাংগেরীয় এক কেমিকৌশলী এডোয়ার্ড টেলর সর্বপ্রথম হাইড্রোজেন বোমা আবিস্কার করেন। অন্যদিকে, ফিশানের শাব্দিক অর্থ বিভাজন; অর্থাৎ একটি ভারী পরমানুকে দ্রুতগামী নিউট্রন দ্বারা ভেঙ্গে হালকা ভরের একাধিক পরমানু ও শক্তি উৎপন্ন করার কৌশলই হল ফিশান বিক্রিয়া। জার্মান বিজ্ঞানী অটোহ্যান ও স্ট্র্যাসম্যান এর মূল তত্ত্ব আবিস্কার করেন। পারমানবিক অস্ত্র সমুহের মধ্যে ফিশানই বহুল পরিচিত। যে সকল তেজস্ক্রিয় পদার্থ এই ফিশান ক্রিয়ায় অংশ নেয় তাদের ফিসাইল পদার্থ বা পারমানবিক বিক্রিয়ার জ্বালানী বলা হয়, যেমন ইউরেনিয়াম - ২৩৫ আইসোটোপ অথবা প্লুটোনিয়াম - ২৩৯ আইসোটোপ সমুহ। একটি দ্রুতগামী নিউট্রন ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম পরমানুকে আঘাত করে কিছু নতুন পরমানু, দুটি নিউট্রন ও প্রচুর পরিমানে শক্তি উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হওয়া পরমানু গুলো আবার নতুন পরমানুকে আঘাত করে বিক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষন না পর্যন্ত জ্বালানী শেষ হয়।

চিত্রঃ

পারমানবিক অস্ত্র উৎপাদনের মূল প্রতিবন্ধকতা হল প্রকৃতিতে প্রাপ্ত তেজস্ক্রিয় মৌলের স্বল্পতা। প্রকৃতিতে ঠিক যে পরিমান ইউরেনিয়াম মজুদ তার ৯৯.২৯ শতাংশ হল ইউরেনিয়াম - ২৩৮ আইসোটোপ, যা দিয়ে পারমানবিক অস্ত্র তৈরী সম্ভব নয় কারন ইউরেনিয়াম -২৩৮ স্বতস্ফুর্ত ভাবে নিউট্রন কণিকা নির্গমন করে ভেঙ্গে যায়। তাই বাকি মাত্র ০.৭৯ শতাংশ প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামকে পৃথক করে বিশুদ্ধ করতেই মূল বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ খরচ হয়ে যায়। এই পৃথকীকরনের কাজে যে যন্ত্র ব্যবহৃত হয় তার নাম সেন্ট্রিফিউজ, আবার এই যন্ত্র দিয়ে ইউরেনিয়াম -২৩৮ কে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ আইসোটোপে পরিনত করা সম্ভব যা ফিসাইল যোগ্য। ২০% বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম -২৩৫ আইসোটোপকে বলা হয় হাইলি এনরিচড ইউরেনিয়াম বা (HEU) এবং ৮০% বা তার অধিক বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম -২৩৫ কে বলা হয় উইপন্স গ্রেডেড ইউরেনিয়াম।

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, একটি পারমানবিক অস্ত্র বানাতে কতটুকু ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম লাগবে? প্রতিটি পারমানবিক অস্ত্র তৈরীতে সর্বনিম্ন যে পরিমান ফিসাইল পদার্থের প্রয়োজন হয় তাকে সংকট ভর বা ক্রিটিক্যাল মাস বলা হয়। অর্থাৎ, এর কম পরিমান ফিসাইল পদার্থ থাকলে নিউক্লিয়ার চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়না। এই সংকট ভর ফিসাইল পদার্থের ঘনত্ব, আকৃতি, বিশুদ্ধতা এবং পদার্থটিকে ঢেকে রাখার জন্য যে বহিরাবনের ধাতব আবরন বা শেল ব্যবহৃত হয় তার ওপর নির্ভর করে। এখানে বলে রাখা ভাল, ফিসাইল পদার্থ তেজষ্কৃয় বলে তারা সর্বদা স্বতস্ফুর্ত ভাবে নিউট্রন কণিকা নিঃসরন করে। তাই জ্বালানীর বহিরাবনটি যদি এমন পদার্থের নির্মিত হয় যা উক্ত নিউট্রন কণিকা সমুহকে কোন উপায়ে প্রতিফলিত করতে পারে, তবে জ্বালানীতে নিউট্রন কণিকার ঘনত্ব বেড়ে যাবে ফলে নিউট্রনের সাথে পরমানুর সংঘর্ষের প্রবনতা বৃদ্ধি পাবে। তাই এই বহিরাবনকে রিফ্লেক্টর টেম্পার বলে যা বেরিলিয়াম ধাতুর তৈরী। সংকট ভরের চেয়ে কম পরিমান ফিসাইল পদার্থকে সাব ক্রিটিক্যাল মাস বা অসংকট ভর এবং সংকট ভরের চেয়ে বেশী পরিমান ফিসাইল পদার্থকে সুপার ক্রিটিক্যাল মাস বা অতিসংকট ভর বলে। বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের সংকট ভর ৫৬ কিলোগ্রাম ও প্লুটোনিয়ামের বেশ কম, মাত্র ১০ কিলোগ্রাম। অর্থাৎ, একটি পারমানবিক অস্ত্র তৈরী করতে কমপক্ষে ৫৬ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম অথবা ১০ কিলোগ্রাম প্লুটোনিয়াম লাগবে। এখন অবশ্য মাত্র ৫ কিলোগ্রাম প্লুটোনিয়াম দিয়ে স্যুটকেইস আকারের পারমানবিক বোমা প্রস্তুতি সম্ভব, কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্লুটোনিয়ামের বিশুদ্ধতা অত্যন্ত বেশি। নির্মান কৌশলের দিক দিয়ে ফিশান পারমানবিক অস্ত্র দু’প্রকার, গান টাইপ ও ইমপ্লোশন টাইপ। গান টাইপ পারমানবিক অস্ত্রের কার্যপ্রণালী খুবই সহজ-সরল কিন্তু দক্ষতা খুবই কম, মাত্র ১.৪ শতাংশ। অপরদিকে ইমপ্লোশন টাইপের দক্ষতা ২০ শতাংশের কাছাকাছি। 

গানটাইপ পারমানবিক অস্ত্রের নির্মানশৈলী অনেকটা বন্দুকের মতন, তাই এর নাম গান টাইপ। একটি লম্বা টিউব, যার গায়ে বেরিলিয়াম মৌলের প্রলেপ লাগানো থাকে, তার দু’প্রান্তে সংকট ভরের চেয়ে কম অর্থাৎ সাব ক্রিটিক্যাল ম্যাসের ফিসাইল পদার্থ ইউরেনিয়াম-২৩৫ রাখা হয়। এক প্রান্তে ইউরেনিয়ামের তৈরি বুলেট ও অপর প্রান্তে একটি নির্দিষ্ট পরিমান ইউরেনিয়াম-২৩৫ জমা থাকে, যাকে বলে টার্গেট। এরপর টিউবের ভেতর সাধারণ বারূদ (কনভেনশনাল এক্সপ্লোসিভ) দিয়ে ইউরেনিয়াম বুলেটকে গতিশীল করা হয় এবং তা অপরপার্শ্বে রক্ষিত টার্গেট ইউরেনিয়ামের সাথে প্রবল বেগে ধাক্কা খায়। সংঘর্ষের পর এরা পরস্পর মিলিত হয়ে সুপার ক্রিটিক্যাল ম্যাস বা অতিসংকট ভর তৈরি করে এবং ফিসাইল পদার্থ হতে নিঃসৃত নিউট্রন কণিকা টেম্পার রিফ্লেক্টরে প্রতিফলিত হয়ে উক্ত ইউরেনিয়াম জ্বালানীকেই আঘাত করে এবং এভাবেই শুরু হয় শৃংখল বিক্রিয়া যার ফলশ্রুতিতে ঘটে পারমানবিক বিস্ফোরণ। ব্যাস তৈরী হয়ে গেল গান-টাইপ পারমানবিক অস্ত্র। জাপানের হিরোসিমায় নিক্ষেপিত ‘লিটল বয়’ ছিলো এই ধরনের অস্ত্র যার শক্তিমাত্রা ছিলো ১৫ কিলোটন টি.এন.টি এবং তাতে ৬৪.১ কিলোগ্রাম বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যাবহৃত হয়। এ পদ্ধতি সহজ হলেও এর জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম খুব বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন যা কিনা বহুল ব্যায়সাধ্য, এছাড়া পূর্বেই বলা হয়েছে গান-টাইপের দক্ষতা খুবই কম ও নির্ভর যোগ্য নয়। তাই গান টাইপের চেয়ে ‘ইমপ্লোসন’ টাইপ আরও অনেক বেশি কার্যকর, কিন্তু এর গঠন প্রণালী বেশ জটিল। 

ইমপ্লোসন টাইপে জ্বালানী হিসেবে ‘পিট’ ব্যাবহৃত হয় যা কিনা লঘু ঘনত্বের ফিসাইল পদার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই পিট বিষাক্ত ও ক্ষয়িষ্ণু (করোসিভ ও হ্যাজার্ডাস) বিধায় পিটের চারিপার্শ্বে নিষ্ক্রিয় ধাতু (যেমন স্বর্ণের) পাতলা আবরণ দেয়া হয়, যা গোলাকার আকৃতির। স্বর্ণের পাতলা আবরণ যুক্ত পিট-কে বেরিলিয়াম-অ্যালুমিনিয়াম এর সংকর ধাতু দ্বারা মুড়িয়ে রাখা হয় যা কিনা ফিসাইল পদার্থ হতে নিঃসৃত নিউট্রন কণিকার প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে, আগেই বলা হয়েছে-এর নাম টেম্পার রিফ্লেক্টর। এবার সম্পুর্ণ ডিভাইসটিকে কারডাইট বিস্ফোরক বা বারূদের মাঝে রাখা হয়। বহিস্তরের কার্ডাইট বিস্ফোরিত হয়ে শক ওয়েভ বা নিনাদের সৃষ্টি করে যা ভেতরে রাখা অল্প ঘনত্বের পিটকে সংকুচিত করে ফেলে ও এর ঘনত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে জ্বালানী অতিসংকট ভর বা সুপার ক্রিটিক্যাল মাসে উপনিত হয় এবং জ্বালানী থেকে নিঃসৃত ও টেম্পার রিফ্লেক্টরে প্রতিফলিত হওয়া নিউট্রন কণিকার আঘাতে নিউক্লিয়ার চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়। যদি পিটের ভেতর অল্প পরিমানে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ (ডিউটেরিয়াম বা ট্রিটিয়াম) ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তবে নিউট্রন কণিকা নিঃসরনের মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যায় এবং অধিক ধংশযজ্ঞ সম্পন্ন হয়, একে ‘বুস্টিং’ বলে। ইমপ্লোসন টাইপ পারমানবিক অস্ত্র ‘হাই এনরিচড ইউরেনিয়াম’ জ্বালানী হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। ফলে স্বল্প পরিশোধিত ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম দ্বারা এ ধরনের পারমানবিক অস্ত্র প্রস্তুত সম্ভব, আর এ কারনেই ইমপ্লোসন টাইপ পারমানবিক অস্ত্র বেশি জনপ্রিয়! জাপানের নাগাসাকিতে নিক্ষেপিত “ফ্যাট ম্যান’ এ ধরনের পারমানবিক অস্ত্র ছিলো।

চিত্রঃ

আজ পর্যন্ত এই দানবিক শক্তিকে বশে বা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি তবুও অত্যান্ত ব্যায়বহুল ও সময়ক্ষেপণে থামানো সম্ভব।

প্রমানঃ



সূত্রঃ ü*n/e=0nu

অর্থাৎ পরমানু বিভাজনে উৎপন্ন নিউট্রনকে যদি শোষণ করা যায় তবে দানবিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

#প্রমানঃ প্রথম আঘাতে উৎপন্ন তিনটি নিউট্রন আবার যখন তিনটি পরমানুকে আঘাত করতে যাবে ঠিক তখন ক্যাডমিয়াম/বোরনকে উৎক্ষেপণ করলে তখন নয়টি নিউট্রন উৎপন্ন না হয়ে দুইটি নিউট্রন উৎপন্ন হবে। একসময় নিউট্রনের সাথে ক্যাডমিয়াম/বোরন বিক্রিয়া করতে করতে নিউট্রন উৎপন্ন কমে যাবে। তখন অটোমেটিক্যালি পরমানু ফিউশন নিষ্ক্রীয় হয়ে নিউট্রন উৎপন্ন বন্ধ হবে।
ফলাফলঃ এভাবে বোরন বা ক্যাডমিয়াম ধাতু দ্বারা পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

##প্রমানঃ আবার প্রত্যেক পদার্থ পরমানু দ্বারা গঠিত।এই পরমানুকে ভাঙলে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ও পজিট্রন পাওয়া যায়। আবার প্রত্যেক পরমানুতে সমসংখ্যক ইলেকট্রন ও প্রোটন থাকে। তবে প্রত্যেক পরমানুতে ইলেকট্রন (–) ঋনাত্নক ও প্রোটন (+) ধনাত্মক চার্জ বহন করে ফলে পরমাণুটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকে। আবার পরমানুর বাহিরের খোলোকে থাকে ইলেকট্রন (–) ঋনাত্নক আর পরমানুর ভিতরের খোলোকে প্রোটন (–) ঋনাত্নক রুপে জড়ো হয়ে থাকে।

তাই কোন বস্তুর সংগে সংঘর্ষের ফলে ইলেকট্রন গুলো সংস্পশে আসে। এবং পরমানু থেকে ইলেকট্রন গুলো অন্যত্র অপসারিত হতে থাকে ফলে পরমানু ফিউশন নিষ্ক্রীয় হয়ে নিউট্রন উৎপন্ন বন্ধ হয়ে যায়।

ফলাফলঃ এভাবে ইলেকট্রন গুলো অপসারিত করে পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

-চলমানঃ ৬/ শেষ পর্ব 

১. Nuclear Energy: Principles, Practices And Prospects – Second Edition by David Bodansky (Reference Text Book, Nuclear Engineering Department, Dhaka University)
২. Nuclear Energy: An Introduction to the Concepts, Systems and Applications of Nuclear Processes – Sixth Edition by Raymond L. Murray (Reference Text Book, Nuclear Engineering Department, Dhaka University)
৩. The University of Arizona
৪. Princeton University
৫. Federation of American Scientists
৬. Union of Concerned Scientists
৭. United States Nuclear Regulatory Commission
৮. Nuclear Energy Institute
৯. World Nuclear Association
১০. Atomic Archive
১১. Nuclear Weapon Archive
১২. Atomic Heritage
১৩. Global Security
১৪. military.com
১৫. The New York Times
১৬. BBC UK
১৭. ABC News

১৮. Bigganjatra.org

পারমাণু, এন্টি-পারমাণু ও বিশ্ব শান্তিঃ ৬ / ৫ম


কালের কলম ।। আরিফুল ইসলাম  
Electron

১৯০৫ সালে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এ্যলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র প্রতিপাদন করেন। তাত্ত্বিকভাবে তখন থেকেই পারমাণবিক শক্তির যাত্রা শুরু। বস্তু বা পদার্থ এবং শক্তি যে দুটি ভিন্ন রূপ এবং পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায় এই সূত্রের সাহায্যেই তা প্রথম প্রমাণিত হয়।

পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটিই হল তাঁর পরিমাণ। অতি অল্প পরিমাণ বস্তু থেকে বিপুল পরিমাণে শক্তি আহরণ করা যায় যেটি অচিন্তনীয় ছিল তখনকার সময়ে। এই শক্তির ব্যবহারে পারমাণবিক চুল্লি মানব সভ্যতা বিকাশে অবদান রাখছে প্রায় অফুরন্ত শক্তি ভাণ্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে; একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্র মানব সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবার মত ভয়াবহতার হাতছানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রথম পর্বে পারমাণবিক শক্তির সাধারণ ধারণা, পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা, পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং পারমাণবিক শক্তি উৎস হিসেবে পরিচিত অধিক ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিষয়বস্তু ছিলো সভ্যতার অগ্রগতিতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor). তৃতীয় পর্বে ছিল পারমাণবিক অস্ত্র পরিচিতি, ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকারভেদ, গঠন ও কার্যপ্রণালীর বিবরণ। চতুর্থ পর্ব ছিলো পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা ও পারমাণবিক অস্ত্র কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে তার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে। পঞ্চম ও শেষ পর্ব সাজানো হল পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস, বর্তমান পৃথিবীতে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ, অতীত থেকে বর্তমানের অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিস্ফোরকের তুলনামূলক শক্তিমাত্রার ধারণা এবং পারমাণবিক শক্তির ব্যাবহারের সাথে মানবজাতি তথা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত তথ্যাদি দিয়ে।

পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রথমবারের মত ব্যবহৃত হয় পারমাণবিক অস্ত্র, দুটি পারমাণবিক বোমা। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’। পৃথিবীবাসী বাকরুদ্ধ হয়ে প্রত্যক্ষ করে এবং আসলে বুঝতে পারে পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এ দুটি পারমাণবিক বোমা ছিল পৃথিবীতে প্রথমবার ও এখনপর্যন্ত শেষবারের মত যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরিত পারমাণবিক বোমা। এর পরে বিভিন্ন সময়ে এর চেয়ে বৃহৎ আকারের ও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে জনমানবহীন এলাকায়; কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ব্যবহৃত হয়নি। বর্তমানে এ থেকে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী পারমাণবিক বিস্ফোরক রয়েছে পৃথিবীতে। সেগুলোর ক্ষমতা সম্পর্কে আন্দাজ করতে হলেও এ দুটোর ধরন, আকার-আকৃতি ও ফলাফল সম্পর্কে জানতে হবে।

Little Boy – লিটল বয়
পৃথিবীর প্রথম ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা : Little Boy

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮:১৬ মিনিটে জাপানের হিরোশিমা শহরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ‘লিটল বয়’ এর। এটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমার ব্যবহার। সেসময় হিরোশিমা শহরে আনুমানিক ২,৮০,০০০ – ২,৯০,০০০ বেসামরিক জনগণ এবং ৪৩,০০০ সামরিক বাহিনীর সদস্য অবস্থান করছিল।

বিস্ফোরণের ফলে ৭০-৭৬ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে ৪৮ হাজার বাড়ি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। ধারণা করা হয় বিস্ফোরণের সাথে সাথে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। চার মাসের মধ্যে ৯০,০০০ – ১,৬৬,০০০ মানুষ মারা যায়, পাঁচ বছরের মধ্যে বিস্ফোরণের প্রভাবে মারা যায় ২ লক্ষ মানুষ। পরবর্তীতে এই পারমাণবিক বোমার ‘লং টার্ম এফেক্ট’ এর প্রভাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২,৩৭,০০০ জনে।

‘লিটল বয়’ বোমার কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেয়া যাক 

১. Gun Type Atom Bomb.
২. Explosive Fuel: Highly Enriched Uranium.
৩. Explosion Power – 15,000 tons of TNT
৪. এর দৈর্ঘ্য ছিল ১০ ফুট, ব্যাস ২৮ ইঞ্চি
৫. ভর – ৯৭০০ পাউন্ড বা ৪৪০০ কেজি বা ৪.৪০ টন।

পৃথিবীতে ব্যবহৃত দ্বিতীয় ও এখন পর্যন্ত শেষ পারমাণবিক বোমা : Fat Man
‘লিটল বয়’ বিস্ফোরণের তিন দিন পর জাপানের নাগাসাকি শহরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ এর। ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট দুপুর ১১:০২ মিনিটে বিস্ফোরিত হয় ‘ফ্যাট ম্যান’। তখন নাগাসাকি শহরে অবস্থান করছিল ২,৪০,০০০ জাপানি বেসামরিক নাগরিক; ৯,০০০ জাপানি সামরিক বাহিনীর সদস্য; ৪০০ যুদ্ধবন্দী সহ প্রায় আনুমানিক ২,৬৩,০০০ মানুষ।

বোমাটি বিমান থেকে ফেলার পর ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬৫০ ফুট উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথে ৪০-৭৫ হাজার মানুষ নিহত হয়। গুরুতর আহত হয় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। বছর শেষে ফ্যাট ম্যান বিস্ফোরণের কারণে মৃতের সংখ্যা পৌঁছে ৮০ হাজারে।

ফ্যাট ম্যান
‘ফ্যাট ম্যান’ বোমার কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেয়া যাক –

১. Implosion Type Atomic Bomb.
২. Explosive Fuel: Highly Enriched Plutonium239
৩. দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং ব্যাস ৫ ফুট
৪. ভর ১০,৮০০ পাউন্ড বা প্রায় ৪,৯০০ কেজি বা ৪.৯ টন।
৫. Explosion Power: 21,000 tons of TNT
৬. ৫,৩০০ পাউন্ড বা প্রায় ২,৪০০ কেজি রাসায়নিক বিস্ফোরক কেন্দ্রের সফটবল আকৃতির ১৩.৬ পাউন্ড বা প্রায় ৬ কেজির প্লুটোনিয়াম গোলককে সংকুচিত করে টেনিস বল আকৃতিতে নিয়ে আসে। ১.১৭৬ কিলোগ্রাম প্লুটোনিয়াম শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল ‘ফ্যাট ম্যান’ এর বিস্ফোরণে।

পৃথিবীতে মজুদ পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ
বর্তমানে বেশ কিছু রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিধর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং এই গুটি কয়েক রাষ্ট্রের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ সীমাবদ্ধ। এদের কারো কাছে বেশি, কারো কাছে কম, কারো আছে ফিশন বোমা, কারো হাতে ফিউশন বোমা, মহাশক্তিধরদের নিয়ন্ত্রণে আবার হাইড্রোজেন বোমা বহনকারী মিসাইল থাকার গুঞ্জনও শোনা যায়। আবার এরা মাঝে মধ্যেই অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে চোখ রাঙিয়ে যেন পাল্লা দিয়ে একের পর এক শক্তিশালী থেকে পর্যায়ক্রমে অধিক শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রের ‘পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ’ ঘটিয়ে এক প্রকার নীরবে জানান দিচ্ছে পৃথিবীর প্রতি তাদের হুমকি।

পারমাণবিক অস্ত্র থাকার তথ্য গোপন সামরিক তথ্য হওয়ায় কঠোর সামরিক নিরাপত্তার মাধ্যমেই এই তথ্য গোপন রাখা হয়। তাই একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয় কোন রাষ্ট্রের কাছে কি পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ আছে। তবুও বিভিন্ন সময় পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের খাতিরে কিছু উন্মুক্ত তথ্য এবং পারমাণবিক শক্তি গবেষকদের ধারণা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কোন কোন রাষ্ট্রে কি পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তার একটি চার্ট প্রকাশ করে The New York Times বিগত বছরের শেষ ভাগে।


চিহ্নিত দেশ সমূহ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদকারী
Federation of American Scientists এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মোটামুটি আটটি দেশের কাছে আনুমানিক মোট প্রায় ১৫০০০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এই রাষ্ট্রগুলো হল পর্যায়ক্রমে রাশিয়া (৭০০০ টি), ইউনাইটেড স্টেটস (U.S. – ৬৮০০ টি), ফ্রান্স (৩০০ টি), চীন (২৬০ টি), ব্রিটেন (U.K. – ২১৫ টি), পাকিস্তান (১৩০ টি), ভারত (India – ১২০ টি) এবং ইসরায়েল (৮০ টি) ।

দেখা যাচ্ছে এদের মধ্যে মহাপরাক্রমশালী অবস্থানে আছে যথাক্রমে রাশিয়া ও ইউনাইটেড স্টেটস। অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্র সংখ্যা এই দুই দেশের তুলনায় এতটাই নগণ্য যে এই দুই রাষ্ট্র ছাড়া বাকি সকলের অস্ত্রের সংখ্যার সমষ্টি এদের যেকোনো একজনের সংখ্যার ২০ শতাংশেরও কম।


পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণের তুলনামূলক লেখচিত্র
এই সাতটি রাষ্ট্র ছাড়াও উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রের সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও গবেষকগণ ধারণা করে থাকেন তাদের অস্ত্রের পরিমাণ ১০ টির কম।

অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ না করলেও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের এক চতুর্থাংশ (যথাক্রমে আনুমানিক ১৭৯০ এবং ১৫৯০ টি) এবং ফ্রান্স তাদের প্রায় সবই সশস্ত্র সামরিক প্রহরায় মোতায়েন করে রেখেছে যেকোনো মুহূর্তের প্রয়োজনে উৎক্ষেপণ বা নিক্ষেপের জন্য।

একটি তথ্য আশা জাগায় যে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ বুঝতে শিখেছে যে পারমাণবিক অস্ত্র সাময়িকভাবে হয়ত একটি রাষ্ট্রকে যুদ্ধে তথাকথিত জয় এনে দিতে পারবে কিন্তু তাতে হারতে হবে পৃথিবীকে। পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না একেবারেই। তাই ‘কোল্ড ওয়ার’ খ্যাত সময়ে বিংশ শতাব্দীর প্রায় শেষ সময়েও যে পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ ছিল তা গত ত্রিশ বছরে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক অস্ত্র মজুদের সর্বোচ্চ অবস্থায় রাশিয়া এবং ইউনাইটেড স্টেটস এর মোট পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ আনুমানিক প্রায় ৭০৩০০ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে এখন তাদের মজুদ মোট আনুমানিক ১৪০০০ তে দাঁড়িয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র মজুদের ইতিহাসের উত্থান-পতন।

বর্তমানের শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনামূলক আকৃতি ও ধ্বংসক্ষমতা

১৫ কিলোটনের ‘লিটল বয়’ আর ২১ কিলোটনের ‘ফ্যাট ম্যান’ এর তুলনায় বর্তমান পারমাণবিক অস্ত্রগুলো কতটা শক্তিশালী তা বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ এর তথ্য থেকে জানা যায়।

এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ Tsar Bomb এর তুলনায় Little Boy আরক্ষিক অর্থেই LITTLE
পাকিস্তানের সর্বশেষ পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ১৯৯৮ সালে – ক্ষমতাঃ ৪০ কিলোটন
ইউনাইটেড কিংডম ১৯৫২ সালে পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় ৫০০ কিলোটন ক্ষমতার IVY King Shot নামের একটি ফিশন বোমা
ইউনাইটেড স্টেটস তাদের প্রথম Thermo-Nuclear Weapon অর্থাৎ হাইড্রোজেন বোমা ‘Castle Bravo’ এর পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় ১৯৫৪ সালে।
তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে স্বভাবতই এর ক্ষমতা ছিল বহুগুণ বেশী। প্রায় ১৫ মেগাটন। ‘লিটল বয়’ এর তুলনায় ১০০০ গুন বেশি শক্তিশালী।
এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী তাপ-পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে রাশিয়া ১৯৬১ সালে। Tsar Bomb – ৫০ মেগাটন ক্ষমতাসম্পন্ন। যা কিনা সরলীকরণ করে বলা চলে ৩৩৩৩ টি ‘লিটল বয়’ এর বিস্ফোরণের সমান ক্ষমতাসম্পন্ন।
এই বোমাটি মূলত ডিজাইন করা হয়েছিল ১০০ মেগাটন ক্ষমতার সমান করে। কিন্তু প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য এর ভিতরে ইউরেনিয়ামের একটি টেম্পার স্তরের পরিবর্তে সীসার স্তর দেয়া হয় যা একটি ফিশন বিস্ফোরণ কমিয়ে দেয় এবং এর ক্ষমতা অর্ধেক হ্রাস করে।
অর্থাৎ এখন পর্যন্ত তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোজেন বোমার ক্ষমতা ১০০ মেগাটন।
Tsar Bomb Test Detonation এর উপর ৩ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র সংযোজিত হলো।


১৯৪৫ সালে বিস্ফোরিত ১৫ কিলোটন এর ‘লিটল বয়’ থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের পদচারণা শুরু হয়ে ১৯৬১ সালে পরীক্ষামূলক বিস্ফোরিত ৫০ মেগাটন ক্ষমতার Tsar Bomb এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র।

নিচের ভিডিওটিতে এই পুরো বিষয়টি গ্রাফিক্যাল ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এখান থেকে আরো ভালভাবে উপলব্ধি করা যাবে বর্তমানের থার্মো-নিউক্লিয়ার অস্ত্রগুলো কতটা মারাত্মক।


ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে ব্যাচেলর ডিগ্রী এবং পরবর্তীতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানের ইতিহাস (History of Science) বিভাগে Ph. D. অর্জন করেন Dr. Alex Wellerstein.
বর্তমানে Stevens Institute of Technology, Hoboken, New Jersey এর  College of Arts and Letters এ  Science and Technology Studies (STS) বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন।

তার ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণা প্রকল্পের সংরক্ষণশালা নিউক্লিয়ার-সিক্রেসি ব্লগের একটি অংশ হল ‘Nukemap’

এখানে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করা হয়েছে পৃথিবীর কোনো অংশে বিভিন্ন মাত্রার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটালে তার ক্ষয়ক্ষতি কেমন হতে পারে তা সহজে বোঝানোর জন্য। এখানে ম্যাপের উপর রঙিন বৃত্তাকার অংশের মাধ্যমে দেখানো হবে কোন পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বিস্ফোরণস্থল বা গ্রাউন্ড জিরো’র চারদিকে আনুমানিক কতটুকু যায়গায় কি ধরণের ক্ষতিসাধিত হবে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রে ঢাকার ‘জিরো পয়েন্ট’ কে গ্রাউন্ড জিরো ধরে ‘ফ্যাট ম্যান’ যে উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়েছিল ১৬৫০ ফুট সেই উচ্চতায় Tsar Bomb এর সমান অর্থাৎ ৫০ মেগাটনের একটি হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণে কি হতে পারে তার ভিজুয়াল ইফেক্ট দেখানো হয়েছে এই চিত্রে।

ঢাকায় Tsar Bomb বিস্ফোরিত হলে আক্রান্ত এলাকার মানচিত্র
সবচেয়ে বাইরের বৃত্তটি ফার্স্ট ডিগ্রী বার্ন, বাইরের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃত্তাকার এলাকা সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন এবং তৃতীয় বৃত্তাকার এলাকা থার্ড ডিগ্রী বার্ন এর সঙ্কটাপন্ন এলাকার অন্তর্গত। দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বৃত্তটি একদিকে বাংলাদেশের সীমানা বরাবর এবং সবচেয়ে বাইরের বৃত্তটি সীমানা পেরিয়ে গেছে অনেকখানি। লম্বা অংশটি ‘রেডিওএ্যাকটিভ ফল-আউট’ নির্দেশক। বাতাসের গতি ওইদিকে থাকলে ফল-আউটের মাধ্যমে এতটা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে তেজস্ক্রিয়তা।

গর্ত, ব্লাস্ট ইফেক্ট, থার্মাল রেডিয়েশন ইফেক্ট কোন কোন এলাকা কি পরিমাণ প্রভাবিত করছে তা বিস্তারিত দেখতে ও জানতে চলে যান এই চিত্রের নিউকম্যাপ পাতায়।

পারমাণবিক শক্তি ও অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানবজাতি তথা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ

এই শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীতে জীবাশ্ম জ্বালানীর সঙ্কট দেখা দেবে এবং বিগত লক্ষাধিক বছরের পরিবর্তনে সৃষ্ট জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে আসবে। ততদিনে পৃথিবীতে নানা কাজের জন্য শক্তির প্রয়োজনে জ্বালানীর যে চাহিদা তার ভগ্নাংশও পূরণ করতে পারবে না অবশিষ্ট জীবাশ্ম জ্বালানি।

এই সঙ্কট উত্তরণের প্রধানত দুটি পথ। অফুরন্ত প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অচিন্তনীয় দক্ষতার পারমাণবিক শক্তি। এর মধ্যে প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য শক্তি সংগ্রহ ও কাজে লাগানো ধীর গতির, সময়সাপেক্ষ ও কম দক্ষতা সম্পন্ন। শুধুমাত্র এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা পূরণ করা দুঃসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভব। তাই আজ হোক কাল হোক পারমাণবিক শক্তির দিকে পৃথিবীকে যেতেই হবে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পারমাণবিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কাজে লাগিয়ে বিশাল পরিমাণে কার্যকরী বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করে অল্প জ্বালানী দিয়ে বছরের পর বছর বিপুল সংখ্যক জনগণ ও বিশাল এলাকার প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করা যায়। জীবাশ্ম জ্বালানী সঙ্কটে ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তিই দিতে পারে বিপুল ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটানোর আশ্বাস। যাতে উত্তর উত্তর এগিয়ে যাবে মানবজাতি।

কিন্তু এই পারমাণবিক চুল্লি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আড়ালে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প এই প্রবল শক্তির আধারকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকেও ধাবিত করতে পারে যার ফলাফল হতে পারে পুরো মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ। কী হতে পারে একটি বড়সড় পরমাণু যুদ্ধের ফলাফল?


Federation of American Scientist এর ভাষ্যমতে প্রথম কথাই হচ্ছে পরমাণু যুদ্ধে আসলে কেউ জিতবে না। সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে চরমভাবে হারবে এবং সেই সাথে হারিয়ে দেবে পৃথিবী, মানবজাতি ও মানবিকতাকে।

যদি ধরা হয়ে বর্তমান পরাক্রমশালী যেকোনো একটি রাষ্ট্রের সকল মোতায়েনকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হল যুদ্ধে। তাহলে কী ঘটবে? সেক্ষেত্রে সেই অস্ত্র সমূহের আঘাতে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, বনাঞ্চল ও আবাসিক স্থলভূমিতে যে প্রকাণ্ড অগ্নিকাণ্ড ও অগ্নিঝড় বয়ে যাবে তাতে সৃষ্ট আনুমানিক ১৮০ মিলিয়ন টন বা ১৮ কোটি টন কার্বন ছড়িয়ে পড়বে পুরো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। বায়ুমণ্ডলে কার্বনের স্তর ঢেকে দেবে সূর্যকে। ভূপৃষ্ঠে সূর্যালোক পৌছবে না। সূর্য থেকে আগত ৭০ শতাংশ আলো ও তাপ আটকে যাবে দুষিত কার্বনের স্তরে। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাবে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।

পৃথিবীর তাপমাত্রা নেমে যেতে থাকবে হিমাংকের নিচে। বছর খানেকের মধ্য বর্তমানে প্রচণ্ড উত্তপ্ত ইউরেশিয়া অঞ্চলের তাপমাত্রাও কমে নেমে যাবে হিমাংকের নিচে। পৃথিবীতে সূচনা হবে আরেকটি বরফ যুগ। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হবে। সামগ্রিক ফলাফলে পৃথিবীর জীবজগতে বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিদ মৃত্যুবরণ করবে এবং জীবজগতে আরেকটি গণবিলুপ্তি দেখা দেবে পৃথিবীতে। গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট ধুলোর স্তরের কারণে একসময় যেমন পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল তেমন আরেকটি জীববিলুপ্তির ঘটনার সাক্ষী হবে পৃথিবী।

এ তো গেল যদি এক দেশের সকল অস্ত্র ব্যবহৃত হয় তার ফলাফল। যদি পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ একাধিক মহাপরাক্রমশালী দুটো দেশের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধ সংঘটিত হয় তবে? যুদ্ধরত দুটো দেশই পুরোপুরিভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ফলাফলে উপরে বর্ণিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আরো প্রবলভাবে এবং আরো দ্রুত দেখা দেবে। বাড়তি বিপর্যয় হিসেবে সেই দুই দেশে অবশিষ্ট সকল পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস হবে ও মিশে যাবে প্রকৃতিতে। রাসায়নিক সংরক্ষণাগার ও শিল্প কারখানা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় সেগুলোতে জমে থাকা ক্ষতিকর ও বিষাক্ত দ্রব্যাদি ছড়িয়ে পরবে পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলে। দুটো বৃহৎ রাষ্ট্রের সকল বিষাক্ত পদার্থ যখন আবহাওয়ায় মিশে যাবে তখন তা ছড়িয়ে পরবে ও প্রাণঘাতী প্রভাব ফেলবে পুরো পৃথিবীর সমগ্র জীবজগতের উপরেই।

এত কিছুর পড়েও পৃথিবীতে যেসকল জীব ও মানুষ কোন ভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হবে (যদি আদৌ টিকে থাকতে সক্ষম হয়) তারা একটি তেজস্ক্রিয় ও বিষাক্ত আবহাওয়ার পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। মানুষের পরবর্তী বংশধরেরা দেখবে তাদের পূর্ববর্তী বংশধরদের অপরিণামদর্শী যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলাফল একটি বিষাক্ত-তেজস্ক্রিয় বাসঅযোগ্য পৃথিবী।

-চলমানঃ ৬/৫ম পর্ব 


তথ্যসূত্র 
১. Nuclear Energy: Principles, Practices And Prospects – Second Edition by David Bodansky (Reference Text Book, Nuclear Engineering Department, Dhaka University)
২. Nuclear Energy: An Introduction to the Concepts, Systems and Applications of Nuclear Processes – Sixth Edition by Raymond L. Murray (Reference Text Book, Nuclear Engineering Department, Dhaka University)
৩. The University of Arizona
৪. Princeton University
৫. Federation of American Scientists

পারমাণু, এন্টি-পারমাণু ও বিশ্ব শান্তিঃ ৬ / ৪থ

কালের কলম ।। আরিফুল ইসলাম

১৯০৫ সালে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এ্যলবার্ট আইনস্টাইন তার ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র প্রতিপাদন করেন। তাত্ত্বিকভাবে তখন থেকেই পারমাণবিক শক্তির যাত্রা শুরু। বস্তু বা পদার্থ এবং শক্তি যে দুটি ভিন্ন রূপ এবং পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায় এই সূত্রের সাহায্যেই তা প্রথম প্রমাণিত হয়।

পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটিই হল তাঁর পরিমাণ। অতি অল্প পরিমাণ বস্তু থেকে বিপুল পরিমাণে শক্তি আহরণ করা যায় যেটি অচিন্তনীয় ছিল তখনকার সময়ে। এই শক্তির ব্যবহারে পারমাণবিক চুল্লি মানব সভ্যতা বিকাশে অবদান রাখছে প্রায় অফুরন্ত শক্তি ভাণ্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে; একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্র মানব সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবার মত ভয়াবহতার হাতছানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রথম পর্বে পারমাণবিক শক্তির সাধারণ ধারণা, পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা, পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং পারমাণবিক শক্তি উৎস হিসেবে পরিচিত অধিক ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিষয়বস্তু ছিল সভ্যতার অগ্রগতিতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor). তৃতীয় পর্বে ছিল পারমাণবিক অস্ত্র পরিচিতি, ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকারভেদ, গঠন ও কার্যপ্রণালীর বিবরণ। চতুর্থ পর্বে থাকছে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা। পারমাণবিক অস্ত্র কেন এত ধ্বংসাত্মক? একটা পারমাণবিক বোমা বা মিসাইলের বিস্ফোরণ কেন ও কিভাবে পুরো একটা শহরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে? পারমাণবিক বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ফলে কী ঘটে যাতে এর ফলাফল প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বয়ে বেড়াতে হয়?

বিস্ফোরণ মাত্রার পরিমাপ ও সাধারণ বিস্ফোরকের সাপেক্ষে তুলনামূলক ধারণা

পারমাণবিক বিস্ফোরকের ক্ষমতা বুঝতে হলে আমাদের সাধারণ বিস্ফোরকের মাত্রা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকতে হবে। ট্রাই-নাইট্রো-টলুইন সংক্ষেপে TNT একটি মারাত্মক বিস্ফোরক পদার্থ। সাধারণত বড়সড় বোমা, কামানের গোলা, ট্যাঙ্কের গোলা ইত্যাদিতে TNT ব্যবহৃত হয়। এর রাসায়নিক সংকেত C7H5N3O6. একটি কামানের ১২৫-১৫৫ মিমি হাই এক্সপ্লোসিভ গোলায় ৫-১০ কিলোগ্রাম TNT ব্যবহৃত হয়। সেক্ষেত্রে সেই বিস্ফোরকের দ্বারা প্রতিপক্ষ যুদ্ধযান, রসদ গুদাম, অস্ত্রাগার ইত্যাদি ধ্বংস করা সম্ভব। এধরনের গোলার বিস্ফোরণে বিস্ফোরণ স্থলের কেন্দ্র থেকে ১০ মিটার ব্যাসার্ধে থাকা সব কিছু সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ২৫-৫০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা সবকিছু মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


১৫৫ মিমি. হাই এক্সপ্লোসিভ আর্টিলারি শেল ডেটোনেশন (animated gif দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন)
এই TNT এর ভরের হিসেবেই পারমাণবিক বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের মাত্রার হিসেব করা হয়ে থাকে।

হিরোশিমায় ব্যবহৃত ‘লিটল বয়’ এর বিস্ফোরণ ক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার টন TNT এর সমান। একেবারে সরল হিসেবে ১৫ লক্ষ 155mm M795 Artillery Shell এর সমান। নাগাসাকিতে ব্যবহৃত ‘ফ্যাট ম্যান’এর বিস্ফোরণ ক্ষমতা ছিল ২১ হাজার টন TNT এর সমান। একেবারে সরল হিসেবে ২১ লক্ষ 155mm M795 Artillery Shell এর সমান। প্রকৃতপক্ষে পারমাণবিক বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ধ্বংসাত্মক প্রভাব আর্টিলারি শেল থেকে অনেক বেশি হয় তার থার্মাল রেডিয়েশন এবং তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে।

পারমাণবিক বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ক্ষমতার একক ‘Kilo-ton TNT’. অর্থাৎ কত কিলোটন বা হাজার টন TNT বিস্ফোরকের সমান। সাধারণত নিউক্লিয়ার ফিশন এক্সপ্লোসিভ এর ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম তাই তাদের বিস্ফোরণ ক্ষমতা হিসেব করা হয় ‘Kilo-ton TNT’ এককে। কিন্তু ফিউশন বোমা যাকে আমরা হাইড্রোজেন বোমা বলে জানি সেগুলোর ক্ষমতা ফিশন বোমা থেকে হাজার গুন বেশি হয়। ফিউশন বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের মাত্রা হিসেব করা হয় ‘Mega-ton TNT’ এককে। এখানে ১ মেগাটন টিএনটি = ১০০০ কিলোটন টিএনটি।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংসযজ্ঞ
একটি সাধারণ কামানের গোলার বিস্ফোরণে কী ঘটে? একটা অগ্নিকুণ্ডের সৃষ্টি হয়, গোলার স্প্লিনটার ও TNT বিস্ফোরণের ব্লাস্ট ইফেক্ট সৃষ্ট উচ্চ চাপ ও ভাঙ্গা ধাতব টুকরা আশেপাশের বস্তুকে ধ্বংস করে এবং উত্তাপে কাছাকাছি দাহ্যবস্তুতে আগুন ধরে যায়। ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা জীব ও জড় বস্তুর ক্ষতি সাধিত হয়। বিস্ফোরণ আওতার বাইরে এর তেমন কোনো প্রভাবই পড়ে না।

১৫৫ মিমি হাই এক্সপ্লোসিভ আর্টিলারি শেল ইমপ্যাক্ট (animated gif দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন)
কিন্তু পারমাণবিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের প্রভাব মোটেই এত স্বল্প পরিসরে নয়। পারমাণবিক বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী প্রভাব বিস্ফোরকের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে বিস্ফোরণ স্থলের সর্বনিম্ন কয়েক কিলোমিটার থেকে শুরু করে ৫০ কিঃমিঃ এর বেশি দূরত্বের এলাকা পর্যন্ত হতে পারে। সেই সাথে বিস্ফোরণ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া তো আছেই।

পৃথিবীর প্রথম ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ আসলে বলা চলে একেবারেই পরীক্ষামূলক ও পারমাণবিক বোমার প্রজন্মের ‘বাচ্চা শিশু’। ২১ কিলোটনের ‘ফ্যাট ম্যান’ বর্তমান সময়ের পারমাণবিক বোমা বা মিসাইলের তুলনায় ক্ষুদ্র একটা অস্ত্র। বর্তমানে কত বড় বড় ও শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র আছে সে সম্পর্কিত তথ্য থাকবে পরবর্তী পর্বে।

এখন এখানে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংস ক্ষমতা বোঝার জন্য বর্তমান প্রজন্মের পারমাণবিক অস্ত্রের সাপেক্ষে নিম্ন-মধ্য ক্ষমতার মধ্যে ১ মেগাটন TNT ক্ষমতার একটি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বা ফিশন মিসাইল এর বিস্ফোরণে কেমন ক্ষতিসাধিত হতে পারে তার একটি আনুমানিক অবস্থা দেখা যাক। কয়েক ধাপে পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কতটুকু স্থান জুড়ে বিস্ফোরণের কী ধরনের প্রভাব দেখা যেতে পারে তা থেকে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ভয়াবহতা সহজে বোঝা যাবে।

গর্ত

১ মেগাটন ক্ষমতার একটি পারমাণবিক বিস্ফোরক যেখানে পড়বে সেখানে দৈত্যাকৃতির গর্ত সৃষ্টি হবে। গর্তের ব্যাস প্রায় ৪০০ মিটার। অর্থাৎ চারটি ফুটবল মাঠ লম্বালম্বিভাবে সাজালে যে দৈর্ঘ্য হবে তেমন ব্যাসের গর্ত। আর গভীরতা হবে প্রায় ৩০০ ফুট; যা প্রায় ৩০ তলা ভবনের সমান। শুধুমাত্র ভূমিতে বিস্ফোরণের (Surface Blast) এর ফলেই Crater তৈরি হয়। বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরিত (Air Blast) হলে Ground Zero অর্থাৎ বিস্ফোরণস্থলের ঠিক নিচে ভূপৃষ্ঠে ছোটখাটো গর্ত হলেও দৈত্যাকৃতি Crater তৈরি হয় না।

অগ্নিকুণ্ড এবং মাশরুম মেঘ

পারমাণবিক বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের সাথে সাথে একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি হয়। এই অগ্নিকুণ্ডের তাপমাত্রা একেবারে শুরুর মুহূর্তে সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার কাছাকাছি। এই তাপমাত্রায় ফায়ারবল বা অগ্নিকুণ্ডের ভেতরে থাকা সব কিছু মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পে পরিণত হয়। বিস্ফোরণের ফলে ছত্রাক আকৃতির ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। এর আকৃতির জন্য একে বলা হয় ‘মাশরুম ক্লাউড’। অগ্নিকুণ্ডের কারণে সৃষ্ট বাষ্পীভূত গ্যাস ও ধূলিকণার সমন্বয়েই তৈরি হয় সেই মাশরুম ক্লাউড।


সারফেস ব্লাস্টে সৃষ্ট মাশরুম ক্লাউডের গঠন ও গতিপ্রকৃতি
১ মেগাটন ক্ষমতার একটি বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে সাথে সাথে এক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে অগ্নিকুণ্ডের ব্যাপ্তি হয় ৪৪০ ফুট এবং দশ সেকেন্ডের মধ্যে এর ব্যাস বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭০০ ফুট বা প্রায় ১.৭ কিঃমিঃ। ঠাণ্ডা হতে হতে দশ সেকেন্ড পরে এতে যে তাপমাত্রা থাকে তা মানুষের চোখে সংবেদী আলো ছড়ায় না। আর এই দশ সেকেন্ডে অগ্নিকুণ্ডের বাইরের অংশে ঘটে যাবে সর্বোচ্চ ওভারপ্রেসারের শক ওয়েভের তাণ্ডব।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের মিলিসেকেন্ড পরে সৃস্ট ফায়ারবল
ভূ-পৃষ্ঠে বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে বিস্ফোরণস্থল থেকে চারদিকে প্রায় ০.৮ কিঃমিঃ এর ভেতরে থাকা সব কিছু সেকেন্ডের মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। ১.৭ কিঃমিঃ ব্যাসের বৃত্তাকার প্রায় ৫ বর্গ কিঃমিঃ একটি এলাকা বিস্ফোরণের প্রায় সাথে সাথেই আক্ষরিক অর্থেই বাতাসে মিলিয়ে যাবে। এই এলাকায় যে চাপ তৈরি হবে তা একটি স্টিম বয়লার এর ভেতরের চাপের কাছাকাছি, প্রায় 200 PSI.

বিস্ফোরণের ফায়ারবলের মধ্যে যারা থাকবে তাদেরকেই সবচেয়ে ‘ভাগ্যবান’ বলা যাবে। কারণ এই অংশের মানুষেরা এমনভাবে চোখের পলকেই মারা যাবে, যে তাদের ‘ভূত’ও দ্বিধায় পড়ে যাবে আসলে ঘটনাটা কী ঘটলো, কখনই বা মারা পড়লো। (* sarcasm alert!)

বিস্ফোরণের ঝলকানি এবং অন্ধত্ব 

পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরপরই একটি অতি উচ্চ ক্ষমতার ও উজ্জ্বল চোখ ঝলসানো আলোর ঝলকানি দেখা যায়।
১ মেগাটনের একটি বিস্ফোরকের বিস্ফোরণে দিনের আলোতে প্রায় ২০ কিঃমিঃ দুর থেকে এবং রাতের অন্ধকারে প্রায় ৮৫ কিঃমিঃ দুর থেকে এই আলোর ঝলকানি দেখা যায়।

এই আলোক ঝলকানি দেখার সাথে সাথে অল্প সময়ের জন্য অস্থায়ী অন্ধত্ব দেখা দেয়। অতিরিক্ত আলোর ঝলকানি চোখে পড়ার সাথে সাথে ১০ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট পর্যন্ত সময়ের জন্য চোখ দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে। ফলে আক্রান্ত লোকজন আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করতে পারে না এবং এরই মধ্যে Blast Shock Wave এবং Thermal Radiation এ আক্রান্ত হয়ে আহত-নিহত হতে শুরু করে।

বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে বিস্ফোরণ স্থলের দিকে সরাসরি তাকালে চোখের রেটিনা পুড়ে গিয়ে স্থায়ী অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে রেটিনায় ফায়ারবলের বিম্ব গঠিত হয় এবং উত্তাপে রেটিনা পুড়ে যায়। এই ঘটনা খুবই বিরল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পারমাণবিক বিস্ফোরণে আক্রান্ত মাত্র একজন ব্যক্তি পাওয়া গেছে যার রেটিনার স্থায়ী অন্ধত্ব ঘটেছে।

বিস্ফোরণের আঘাত তরঙ্গ বা Blast Shock Wave

ফায়ারবলের ভেতরে সবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ায় এবং বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তিতে চারদিকে ব্যাপক চাপে শক ওয়েভ ছড়িয়ে পড়ে। এটির বৈশিষ্ট্য অনেকটা এমন যেন প্রচণ্ড ঝড়ো গতিতে উচ্চচাপে থাকা বাতাসের একটা দেয়াল সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে এগিয়ে যেতে থাকে।

যদি ভূ-পৃষ্ঠে বিস্ফোরণ হয় তবে শক্তিশালী একটি শক ওয়েভই কার্যকরী হয়। কিন্তু যদি বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরণ ঘটে, অর্থাৎ যদি ভূমি থেকে কয়েক হাজার ফুট উপরে বিস্ফোরণ ঘটে তবে প্রাথমিক বিস্ফোরণের শক ওয়েভ তো ছড়িয়ে পড়বেই, তার সাথে যুক্ত হবে ভূমি থেকে প্রতিফলিত আরেকটি ধাক্কা। এদের মিলিত চাপকে ওভারপ্রেশার বলে। এই ওভার প্রেশারের পরিমাপের উপরেই কতটুকু অঞ্চল কি পরিমাণে বিধ্বস্ত হবে তা নির্ভর করে।

সর্বোচ্চ চাপের আঘাত তরঙ্গ

১ মেগাটনের বিস্ফোরণে বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে ২.২৫ কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের দূরত্বে (অগ্নিকুণ্ডের সীমানার বাইরে আরো এক কিঃমিঃ বেশি ব্যাসার্ধে) প্রায় ১৫ বর্গ কিঃমিঃ এলাকা জুড়ে (৪.৫ কিঃমঃ ব্যাসের বৃত্তাকার এলাকা) শক ওয়েভের তাণ্ডব দেখা যাবে। এই শক ওয়েভে বাতাসের চাপ থাকে আনুমানিক 20 PSI এবং গতিবেগ প্রায় ৮০০ কিঃমিঃ প্রতি ঘণ্টা। প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ২০ পাউন্ড মানে প্রায় ৯ কেজি বলে আঘাত করবে ঝড়ো গতির বাতাসের ধাক্কা। সহজে বোঝার জন্য মনে করুন আপনার ৫ ইঞ্চি স্ক্রিনের স্মার্টফোনের উপর একটা ৪৫ কেজির পাথর আছড়ে পড়লে যে অবস্থা হবে এই শক ওয়েভ আওতার ভেতরে থাকা সবকিছুর একই অবস্থা হবে। বিস্ফোরণের দশ সেকেন্ডের মধ্যে শক ওয়েভের এই আঘাতে এ অঞ্চলের সব মানুষ মারা যাবে। ছোটখাটো ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, মাঝারি থেকে বড়সড় স্থাপনা পুরোপুরিভাবে বিধ্বস্ত হবে। অতি উচ্চ মানের নিরাপত্তা বিশিষ্ট ও উচ্চ শক্তির কংক্রিট নির্মিত স্থাপনা গুরুতরভাবে অনেকাংশে ভেঙ্গে পড়বে। এই শক ওয়েভ ছড়িয়ে পড়তে থাকবে এবং এর চাপ ও গতি কমে আসবে।

মধ্যম চাপের আঘাত তরঙ্গ

সর্বোচ্চ ওভারপ্রেশারের সীমানার বাইরে গতি ও চাপ ক্রমাগত কমে শক ওয়েভের কিছুটা দুর্বল অংশে চাপ ও গতি দাঁড়াবে যথাক্রমে 5 PSI এবং ২২০ কিঃমিঃ প্রতি ঘণ্টা এবং আরো কমতে কমতে এর সীমানার বাইরে ক্ষতিকর মাত্রার নিচে নেমে যাবে। উল্লেখ্য, 3 PSI চাপের শক ওয়েভ এর ধাক্কাই সকল সাধারণ আবাসিক ভবন বিধ্বস্ত হবার জন্য যথেষ্ট।
অর্থাৎ আবাসিক এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটালে মিডিয়াম ওভারপ্রেশারের সীমানার মধ্যে থাকা অল্প কিছু অতিরিক্ত সুরক্ষিত ও শক্তিশালী ভবন ব্যতীত সকল ভবন ধসে যাবে ও প্রাণহানি ঘটবে। ১ মেগাটনের একটি বিস্ফোরণে মিডিয়াম ওভারপ্রেশারের কার্যকর বিস্তৃতি বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে ৪.৫ কিঃমিঃ পর্যন্ত। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ওভারপ্রেশারের সীমানার বাইরে আরো ২.২৫ কিঃমিঃ বেশি দুরত্বে ছড়িয়ে পরবে মিডিয়াম ওভারপ্রেশার শক ওয়েভ। মিডিয়াম ওভারপ্রেসারের ধাক্কায় ধ্বংস হবে প্রায় ৯ কিঃমিঃ ব্যাসের ৬৫ বর্গ কিঃমিঃ এলাকা।

নিম্ন চাপের আঘাত তরঙ্গ

মিডিয়াম ওভারপ্রেশারের শক ওয়েভ দূরত্বের সাথে আরো দুর্বল হয়ে ক্রমান্বয়ে চাপ কমে 1.5 PSI চাপে নেমে আসে। এই শক ওয়েভ দরজা জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলার জন্য যথেষ্ট। উজ্জ্বল চোখ ঝলসানো আলো যেহেতু শক ওয়েভের চেয়ে দ্রুতগামী তাই সেই আলোর ঝলকানি এবং মাশরুম ক্লাউড দেখে দূরের মানুষেরাও দরজা জানালার কাছে যায় এবং তখন কাঁচ ভেঙ্গে প্রচুর লোক আহত হয়। এই শক ওয়েভ কাঁচের দরজা জানালা এবং হালকা ও মাটির সাথে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ নয় এমন স্থাপনা দূরে ছুঁড়ে ফেলতে সক্ষম। এই শক ওয়েভের কার্যকারিতা হতে পারে প্রায় কেন্দ্র থেকে ৯.৭৫ কিঃমিঃ দুর পর্যন্ত। বিস্ফোরণ কেন্দ্রের চারিদিকে ১৯.৫ কিঃমিঃ ব্যাসের বৃত্তের এলাকায় দরজা-জানালার কাঁচ অবশিষ্ট থাকবে না। বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে চারিদিকে প্রায় ২০ কিঃমিঃ ব্যাসের বৃত্তাকার এলাকা সরাসরি বিস্ফোরণের শক ওয়েভ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

তাপজনিত বিকিরণ

পারমাণবিক বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের পরবর্তী ধ্বংসাত্মক ধাপ হলো Thermal Radiation বা তাপজনিত বিকিরণ। বিস্ফোরণের কেন্দ্রে সৃষ্ট অগ্নিকুণ্ডে যে অতি উচ্চ তাপের সৃষ্টি হবে তা তাপীয় বিকিরণ প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে থাকবে চারিদিকে অতি দ্রুত। এই বিকিরণের অত্যাধিক তাপীয় শক্তি, বিকিরণের কার্যকরী অঞ্চলকে অল্প সময়ের মধ্যেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করবে।

অগ্নিকাণ্ড এবং অগ্নিঝড়

বিস্ফোরণে সৃষ্ট তাপ চারিদিকে বিকিরিত হতে থাকবে এবং যত দূরত্ব বাড়বে এর শক্তিমাত্রা তত কমতে থাকবে। বিস্ফোরণ কেন্দ্রের চারিদিকে ৬.৫ কিঃমিঃ পর্যন্ত এলাকায় এই তাপ বিকিরণের মান সর্বোচ্চ প্রায় ৩৫ ক্যালরি/বর্গ সেঃমিঃ বা তার বেশি। এখানেই তাপজনিত বিকিরণ সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে থাকে। এতে তাপের পরিমাণ এতই বেশি থাকে যে এর পথে থাকা যে কোনো খোলা দাহ্য বস্তু যেমন শুকনো কাপড়, কাঠ, কাগজ, শুকনো পাতা, গাছ ইত্যাদি এই তাপীয় বিকিরণের উষ্ণতার প্রভাবে নিজে নিজেই জ্বলে উঠবে। শক ওয়েভে ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় জ্বালানী ও রাসায়নিক পদার্থের সংরক্ষণাগার, গ্যাস ও তেল সরবরাহ লাইন উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় এগুলোতে আগুন ধরে যাবে এবং বৃহৎ সংরক্ষণাগার গুলোতে আগুন লেগে যাবার ফলে বিস্ফোরণ ঘটতে থাকবে। ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দাহ্য সকল বস্তুতে আগুন লেগে যাবে। অর্থাৎ ফায়ারবলের বাইরেও প্রায় ১৩ কিঃমিঃ ব্যাসের ৪০ বর্গ কিঃমিঃ বৃত্তাকার এলাকা পুরোপুরি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে। এই ঘটনাকে বলা হয় Firestorm.

সর্বোচ্চ দগ্ধকরণ বা Third Degree Burn

মানবদেহের প্রতি বর্গ সেঃমিঃ এ ৯.৫-১০ ক্যালরি বিকিরিত তাপ পতিত হলে সেখানে থার্ড ডিগ্রী বার্ন হয়ে থাকে। ১ মেগাটন বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ কেন্দ্রের চারিদিকে প্রায় ১০ কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের এলাকায় প্রায় শতভাগ মানুষের থার্ড ডিগ্রী বার্ন হবে। থার্ড ডিগ্রী বার্ন সবচেয়ে গভীর পোড়া। কিন্তু এক্ষেত্রে তাপজনিত বিকিরণ সবচেয়ে ব্যথাহীন ও অনুভূতিহীন পোড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাপজনিত বিকিরণ চোখের পলকে চামড়ার স্তর ভেদ করে নার্ভ টিস্যু বা স্নায়ু কলা পুড়িয়ে দেবে যাকে বলা হয়ে থাকে থার্ড ডিগ্রী বার্ন। চামড়ার নিচের স্নায়ু কলা ও ব্যথাসংবেদী কোষ (Pain receptor) পুড়ে নষ্ট হয়ে যাবার ফলে ব্যক্তি পোড়ার ক্ষত থেকে কোনো ব্যথা অনুভব করবে না। কিন্তু এই ব্যথাহীন থার্ড ডিগ্রী বার্ন এর গভীর পোড়া ক্ষত, কখনো কখনো বিকলাঙ্গতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এমনকি অঙ্গচ্ছেদন এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। বিস্ফোরণ স্থলকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০ কিঃমিঃ ব্যাসের এলাকার সকল মানুষের চামড়া পুরোপুরি ঝলসে যাবে ও সবাইকে মারাত্মক আহত করবে।

মধ্যম দগ্ধকরণ বা Second Degree Burn

থার্ড ডিগ্রী বার্নের সীমানার পরে বিকিরণের মাত্রা ক্রমান্বয়ে কমে প্রায় অর্ধেকে অর্থাৎ ৬ ক্যালরি/বর্গ সেঃমিঃ এ চলে আসে। এই তাপে চামড়ায় সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন দেখা দেয়। সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন সবচেয়ে কষ্টদায়ক পোড়া। এটি যথেষ্ট গভীর পোড়া। চামড়ার কয়েকস্তর পুরোপুরি ঝলসে যায় তবে স্নায়ু কোষ ও ব্যথাসংবেদী কোষ ঝলসে না যাওয়াতে পুড়ে যাবার অনুভূতি ও তীব্র যন্ত্রণা চরমভাবে উপলব্ধি করা যায়। সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন এর ফলে গভীর ক্ষত ও পোড়া দাগ এর সৃষ্টি হয়। এটির চিকিৎসায় স্কিন গ্রাফটিং অর্থাৎ শরীরের অন্য অংশের চামড়া বসিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। কিন্তু পারমাণবিক বিস্ফোরণের সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন এর ক্ষেত্রে কাপড়ের বাইরে থাকা বেশিরভাগ উন্মুক্ত অংশের চামড়া পুড়ে যাওয়াতে স্কিন গ্রাফটিং করার সুযোগটি সহজে পাওয়া যায় না। যথাযথ চিকিৎসায় সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু পারমাণবিক বিস্ফোরণে আক্রান্ত অঞ্চলে যথাযথ চিকিৎসা বাতুলতা মাত্র। তাতে দেখা যায় সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন এর ঘটনাও প্রাণঘাতী। বিস্ফোরণ স্থলের প্রায় ১২ কিঃমিঃ পর্যন্ত দূরত্ব পর্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ মানুষ সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন এ আক্রান্ত হবে।

সর্বনিম্ন দগ্ধকরণ বা First Degree Burn

ফার্স্ট ডিগ্রী বার্ন সবচেয়ে কম এবং ক্ষতহীন পোড়া বলা যেতে পাড়ে। এটি শুধু চামড়ার উপরের স্তর পুড়িয়ে ফেলে। এতে কিছুটা পুড়ে যাবার ব্যথা অনুভব করা গেলেও এটাকে মোটামুটি অতিরিক্ত ‘সান বার্ন’ বলা যেতে পারে। ‘সান বার্ন’ হলে যেমন চামড়া পুড়ে কালো হয়ে যায় ফার্স্ট ডিগ্রী বার্ন তেমনটাই তবে পরিমাণে আরেকটু বেশি হয়। এক্ষেত্রে কোনো ক্ষত হয় না এবং ৫-১০ দিনের মধ্যে সেরে ওঠে। সেকেন্ড ডিগ্রী বার্নের আওতার বাইরে বিস্ফোরণ স্থলের চারিদিকে পরে ১৪-১৫ কিঃমিঃ দূরত্ব পর্যন্ত ফার্স্ট ডিগ্রী বার্ন এর ঘটনা ঘটে থাকে। অর্থাৎ, বিস্ফোরণ কেন্দ্রের চারিদিকে প্রায় ৩০-৩৫ কিঃমিঃ ব্যাসের বৃত্তাকার এলাকা বিস্ফোরণের তাপজনিত বিকিরণের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তেজস্ক্রিয় বিপর্যয় এবং দূষণ

পারমাণবিক বিস্ফোরণের বেশ বিস্তৃত একটি প্রভাব হচ্ছে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ও দূষণ। বিস্ফোরণের ব্লাস্ট ওয়েভ ও থার্মাল রেডিয়েশনের সংকটাপন্ন অঞ্চলের বাইরের বৃহৎ একটা অঞ্চলের মানুষ ও পরিবেশ আক্রান্ত হয় তেজস্ক্রিয় দূষণে।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের সাথে সাথে যে বিকিরণ নির্গত হয় সেটি গামা রশ্মির বিকিরণ, নিউট্রন বিকিরণ এবং আয়নাইজড বস্তুকণার বিকিরণ। যতক্ষণ বিস্ফোরকের পারমাণবিক বিক্রিয়া চলে এই বিকিরণ ততক্ষণ স্থায়ী হয় এবং এই বিকিরণের পরিমাণ প্রাণঘাতী। তবে এই বিকিরণের পাল্লা খুব বেশি হয় না। অগ্নিকুণ্ডের দ্বিগুণ ব্যাসের বৃত্তাকার অংশে প্রাণঘাতী এই মাত্রাতিরিক্ত বিকিরণ আঘাত হানে। এই পরিমাণের বিকিরণে আক্রান্ত মানুষ কয়েক ঘণ্টা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়। তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের মানুষ ব্লাস্ট শক ওয়েভ এবং তাপজনিত বিকিরণেই মারা পড়ে।

কিন্তু এই প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এই অংশের সব বস্তুকে উচ্চ তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত করে। বিস্ফোরকের অব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ ও উচ্চ দূষণে দূষিত বস্তুকণা শক ওয়েভের কারণে উড়ে গিয়ে বায়ুমণ্ডলে মেশে এবং দূরে গিয়ে ভূপৃষ্ঠে ছিটকে পড়ে।
অগ্নিকুণ্ডের ভেতরে থাকা বাষ্পীভীত গ্যাস ও ধূলিকণা মাশরুম ক্লাউড এর সাথে উপরে ওঠে ও ছড়িয়ে পড়ে। এই কণার বৃহৎ অংশ আশেপাশেই ভূপাতিত হয় কিন্তু মিলিমিটারের ভগ্নাংশ থেকে কয়েক মিলিমিটারের বস্তুকণা উচ্চচাপের বায়ু প্রবাহের সাথে উড়ে গিয়ে বায়ু প্রবাহের দিকের অঞ্চলে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পরে। এসকল তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত কণা যে সকল স্থানে উড়ে গিয়ে পরে সেখানে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকে। এভাবে বিস্ফোরণের সরাসরি প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাইরেও ব্যাপক এলাকায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পরে।

তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত বস্তুকণার বিস্তৃত অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহের সাথে ছড়িয়ে পড়াকে বলা হয় Radioactive Fallout বা তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়। বিস্ফোরণ পরবর্তী তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে অস্ত্রের ডিজাইন, বিস্ফোরণের অবস্থান মাটির কতটা কাছাকাছি বা কতটা উপরে, বিস্ফোরকে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থের ধরনের উপর নির্ভর করে তেজস্ক্রিয় বিপর্যয় সপ্তাহ, মাস এমনকি বছরকাল ব্যাপী স্থায়ী হতে পারে। তবে প্রথমদিকেই বিপর্যয়ের পরিমাণ বেশি থাকে। যত দিন যায় বিপর্যয় চললেও মাত্রা কমে আসে।

১ মেগাটনের একটি বিস্ফোরকের ব্লাস্ট শক ওয়েভ ও থার্মাল ওয়েভে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে চারিদিকে সর্বোচ্চ ২০ কিঃমিঃ পর্যন্ত হয়। কিন্তু একটি জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভূপৃষ্ঠে এই বিস্ফোরণ ঘটালে তার Radioactive Fallout বিস্ফোরণ স্থল থেকে বায়ুপ্রবাহের দিকে ৩৭৫ কিঃমিঃ দূরত্বে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সেক্ষেত্রে আক্রান্ত অঞ্চল মারাত্মক তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত হবে।

ভূ-পৃষ্ঠে বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে প্রচুর বস্তুকণা মাশরুম ক্লাউডের সাথে উপরে উঠে যায় ও ফল-আউট এর মাধ্যমে পতিত হয়। এজন্য ভূ-পৃষ্ঠে বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে রেডিওএ্যাকটিভ ফল-আউটের ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় প্রভাব বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরণের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব

Radioactive Fallout এর সীমানার ভেতর যে অঞ্চল বিস্ফোরণ স্থলের যত কাছে হবে সেখানে তেজস্ক্রিয় দূষণের মাত্রা ও প্রভাব তত বেশি হবে এবং দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে দূষণের মাত্রা ও ক্ষতিকর প্রভাব তত কমে আসবে।

বিস্ফোরণস্থলের কাছাকাছি এলাকায় তুলনামূলক বেশি তেজস্ক্রিয় দূষণের ফলে সেখানে তেজস্ক্রিয় বিকরণের সংস্পর্শে আসা মানুষদের চুল পড়ে যাওয়া, রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা কমে যাওয়া, থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি অসুস্থতা দেখা দেয়। শ্বেত কণিকা কমে যাওয়ায় ফ্লু জাতীয় রোগে সহজেই আক্রান্ত হয়ে পরে মানুষ। এছাড়া শরীরের তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত অংশের কোষ এর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফলে টিউমার ও ক্যান্সার এর উৎপত্তি ঘটতে পারে।

তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব

বিস্ফোরণ স্থল থেকে বেশ কিছুটা দূরবর্তী স্থানে; শক ওয়েভ ও থার্মাল রেডিয়েশনের ক্ষতিকর দূরত্বের বাইরের বিস্তৃত অঞ্চলে এবং রেডিওএ্যাকটিভ ফল-আউট আক্রান্ত স্থানের তেজস্ক্রিয় দূষণের তাৎক্ষনিক প্রভাব নজরে না পরলেও দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল ঠিকই পরিলক্ষিত হয়। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবে মানবদেহের ক্রোমোজোম প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হতে পারে। এজন্য তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক বা একাধিক প্রজন্ম পরেও কখনো কখনো তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়।

বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয়তা ও Radioactive Fallout এর তেজস্ক্রিয় দূষণের প্রভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল এমনকি পুরো একটি শহর বা দেশের ভৌগলিক পরিবেশ, বাস্তুসংস্থান, আবহাওয়া ইত্যাদি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। এমনকি কখনো কখনো বিস্ফোরণ স্থলের উপরের বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তরের ভাঙ্গন ঘটতে পারে।

এই হলো পারমাণবিক বিস্ফোরণের বিস্তীর্ণ ধ্বংসলীলা ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল। এখানে যে দূরত্বে যতটুকু ক্ষতিকর তাণ্ডবের বর্ণনা রয়েছে সেটি হল একটি ১ মেগাটন ক্ষমতার নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড বা মিসাইল এর বিস্ফোরণের  ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা। সর্বশেষ সর্বোচ্চ ক্ষমতার যে ফিউশন বোমার (হাইড্রোজেন বোমা) পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে সেটির ক্ষমতা ছিল ৫০ মেগাটন এবং সর্ববৃহৎ ফিউশন বিস্ফোরক যেটি তৈরির গবেষণা চলছে সেটি হতে যাচ্ছে ১০০ মেগাটন ক্ষমতা সম্পন্ন।

হিরোশিমায় ফেলা হয়েছিল ১৫ কিলোটন এর গান টাইপ ফিশন বোমা। সেই ঐতিহাসিক বিস্ফোরণের সাক্ষী ও বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে BBC একটি শ্রুতি ডকুফিল্ম তৈরি করেছে। এখান থেকে কিছুটা হলেও অনুমান করা যাবে এর হাজার গুণ শক্তিশালী অর্ধশত বা শত মেগাটনের ফিউশন বোমা বা মিসাইলের ধ্বংসক্ষমতা কত।

-চলমানঃ ৫/ ৪র্থ পর্ব 

তথ্যসূত্র

পারমাণু, এন্টি-পারমাণু ও বিশ্ব শান্তিঃ ৬ / ৩য়

কালের কলম ।। আরিফুল ইসলাম
আপনার শহরে অ্যাটমিক হামলা হলে 
১৯০৫ সালে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এ্যলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র প্রতিপাদন করেন। তাত্ত্বিকভাবে তখন থেকেই পারমাণবিক শক্তির যাত্রা শুরু। বস্তু বা পদার্থ এবং শক্তি যে দুটি ভিন্ন রূপ এবং পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায় এই সূত্রের সাহায্যেই তা প্রথম প্রমাণিত হয়। পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটিই হল তাঁর পরিমাণ। অতি অল্প পরিমাণ বস্তু থেকে বিপুল পরিমাণে শক্তি আহরণ করা যায় যেটি অচিন্তনীয় ছিল তখনকার সময়ে। এই শক্তির ব্যবহারে পারমাণবিক চুল্লি মানব সভ্যতা বিকাশে অবদান রাখছে প্রায় অফুরন্ত শক্তি ভাণ্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে; একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্র মানব সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবার মত ভয়াবহতার হাতছানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এই সিরিজের প্রথম পর্বে পারমানবিক শক্তির সাধারণ ধারণা, পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা, পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং পারমাণবিক শক্তি উৎস হিসেবে পরিচিত অধিক ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিষয়বস্তু ছিল সভ্যতার অগ্রগতিতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor). তৃতীয় পর্ব সাজানো হচ্ছে পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে অমানবিক এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যবহার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে; সংক্ষেপে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকারভেদ, গঠন, ও কার্যপ্রণালী নিয়ে।

পারমাণবিক অস্ত্র কী?
WMD (Weapon of Mass Destruction) হচ্ছে এমন এক ধরনের অস্ত্র যা একটা বৃহৎ ভৌগলিক অংশে বৃহৎ জৈব, পরিবেশগত বা ধ্বংসাত্মক ক্ষতি সাধিত করতে সক্ষম। সাধারণত জৈব অস্ত্র, রাসায়নিক অস্ত্র এবং পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্র এই ধরনের অস্ত্রের আওতাধীন। বলতে গেলে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক ও শক্তিশালী হল পারমাণবিক অস্ত্র। জৈব অস্ত্রের প্রভাবে একটি বড়সড় ভৌগলিক এলাকার জীববৈচিত্র বিলুপ্ত হতে পারে, এমনকি সকল জীবের মৃত্যু ঘটতে পারে। রাসায়নিক অস্ত্রের প্রয়োগে জীববৈচিত্র সহ সেখানকার পরিবেশগত বড় ধরনের ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটতে পারে যাতে সেখানে বসবাস অনুপযুক্ত অবস্থা বিরাজ করতে পারে। এই দুটোই তুলনামূলক ধীর প্রক্রিয়া। প্রয়োগের পরে কিছু সময় লাগে কার্যকরী হতে ও ফলাফল পেতে। অপরদিকে পারমাণবিক অস্ত্র এককথায় বললে বিশাল এলাকায় এই দুটো ফলাফল সহ পুরো সভ্যতার বিলীন ঘটাতে সক্ষম কয়েক সেকেন্ডে। এমনকি এর রেশ থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে। পারমাণবিক অস্ত্র গুলো WMD, এগুলো বিস্ফোরক অস্ত্রের আওতাধীন এবং অচিন্তনীয় বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতেই ব্যবহার করা হয়। বোমা, মিসাইল ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ। আপাতত লেখা ও বোঝার সুবিধার্থে ‘পারমাণবিক বিস্ফোরক’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করছি।

পারমাণবিক চুল্লিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। পারমাণবিক বিক্রিয়া ও শৃঙ্খল বিক্রিয়া (চেইন রিএ্যাকশন)-কে কাজে লাগিয়ে যে পারমাণবিক শক্তি আহরণ করা হয়; একই পদ্ধতিতেই পারমাণবিক অস্ত্রেও শক্তি উৎপাদন করা হয় শুধু পার্থক্য হল পারমাণবিক চুল্লিতে এই বিক্রিয়া ও শক্তি উৎপাদন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় আর পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে এই শক্তি উৎপাদন ও বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয় বিস্ফোরণের মাত্রা অনুযায়ী।

প্রথম পর্বে আইনস্টাইনের ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র অংশে দেখানো হয়েছিল কিভাবে খুবই অল্প পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি পাওয়া যায় পারমাণবিক বিক্রিয়ায় যার বেশিরভাগই তাপশক্তি আকারে নির্গত হয়। এই অত্যধিক শক্তি যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে নির্গত হয় তখন সেটাই হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে শুধু মাত্র পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়া থেকেই শক্তি উৎপাদন করা হয়। প্রথম দিককার পারমাণবিক অস্ত্রের জন্যও শুধু ফিশন বিক্রিয়াই ব্যবহৃত হত। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষে বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রে ফিউশন বিক্রিয়াও ব্যবহৃত হচ্ছে যা পূর্বের ফিশন ভিত্তিক অস্ত্রের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক। 

পারমানবিক বিস্ফোরকের মূলনীতি
পারমাণবিক বিক্রিয়ক বিয়োজনযোগ্য পদার্থের (fissionable material) একটি বৈশিষ্ট্য হলো ক্রান্তীয় ভর (Critical Mass). ক্রান্তীয় ভর হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ফিশনেবল ম্যাটারিয়ালের এমন একটি নূন্যতম ভর, যে ভরে পৌঁছালে তা শুরু হবার পর শৃঙ্খল বিক্রিয়া স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারে। নির্দিষ্ট ফিশনেবল ম্যাটেরিয়াল এর ক্রান্তীয় ভর যেসব বিষয়ের উপর নির্ভরশীল সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আকার-আকৃতি, ঘনত্ব, বিশুদ্ধতা, পারিপার্শ্বিক নিউট্রন রিফ্লেক্টরের বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি।

কোনো ফিশনেবল ম্যাটেরিয়ালের ভর যদি ক্রিটিক্যাল ভরের চেয়ে কম হয় (Sub critical Mass) তাহলে সেখানে চেইন রিএ্যাকশন স্থায়ী হবে না। যখনই সেখানে আরো ভর সংযুক্ত করে অর্থাৎ একাধিক সাব-ক্রিটিক্যাল ভরবিশিষ্ট মৌলের খণ্ড একত্র করা হবে তখনি সেখানে ভর ক্রিটিক্যাল ভরের চেয়ে বেশি হবে (Super critical mass) এবং চেইন রিএ্যাকশন স্থায়ী হবে ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হবে যা বিস্ফোরক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

পারমাণবিক বিস্ফোরকে প্রধান ফিশন ফুয়েল হিসাবে ব্যবহৃত হয় তেজস্ক্রিয় মৌল ইউরেনিয়াম২৩৫ এবং প্লুটোনিয়াম২৩৯ । ছোট আকারের ও কম ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরকের ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম২৩৫ এবং অধিক শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরকের জন্য প্লুটোনিয়াম২৩৯ ব্যবহৃত হয়।

পারমাণবিক বিস্ফোরকের প্রকারভেদ, গঠন ও কার্যপ্রণালী
সাব-ক্রিটিক্যাল ভর থেকে সুপার-ক্রিটিক্যাল ভরে নিয়ে আসার পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে পারমাণবিক ফিশন বিস্ফোরক (Nuclear Fission Explosive) দুই ভাগে বিভক্ত।

১. গান টাইপ (Gun Type) – হিরোশিমায় ব্যবহৃত Little Boy এ ধরনের বোমা
২. ইমপ্লোশন টাইপ (Implosion Type) – নাগাসাকিতে ব্যবহৃত Fat Man এ ধরনের বোমা

‘গান টাইপ’ পারমাণবিক বোমার ‘সেকশন ভিউ’
গান টাইপ পারমাণবিক বিস্ফোরক মূলত তুলনামূলক ছোট ও কম শক্তিশালী পারমাণবিক বিস্ফোরক। এটিতে সাব-ক্রিটিক্যাল ভরের একাধিক খণ্ড মিলে সুপার-ক্রিটিক্যাল ভরে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর। এজন্য এধরনের বিস্ফোরকে ইউরেনিয়াম২৩৫ ব্যবহৃত হয়, এখানে প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করা যায় না।

এধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরকে একটি ব্যারেলের এক প্রান্তে Chain Reaction Initiator এর উপর বসানো থাকে সাব-ক্রিটিক্যাল ভরের ইউরেনিয়াম খণ্ড যা ডিস্ক বা ফাঁপা টিউব আকৃতির হতে পারে। এটা এক বা একাধিক ভাগে কিছুটা দূরে দূরে থাকতে পারে। একে ইউরেনিয়াম কোর বলা হয়। অপর প্রান্তে ডেটোনেটরের সামনে বসানো থাকে সাব-ক্রিটিক্যাল ভরের আরেক অংশ। এটিও এক বা একাধিক খণ্ডে থাকতে পারে। একে বলা হয় ইউরেনিয়াম বুলেট।

ইউরেনিয়াম কোর এবং বুলেটের সকল অংশ পৃথক পৃথক ভাবে ক্রিটিক্যাল ভরের চেয়ে কম ভর বিশিষ্ট হয় এবং এখানে চেইন রিএ্যাকশন স্থায়ী হয় না। যখনই এগুলো একত্রিত হয় তখন সেখানে ক্রিটিক্যাল ভরের চেয়ে অনেক বেশি ভর পাওয়া যায় যা চেইন রিএ্যাকশনের স্থায়িত্বের জন্য যথেষ্ট।

বিস্ফোরক যখন ডেটোনেট করা হয় তখন ডেটোনেটর এক্সপ্লোসিভ বিস্ফোরিত হয় এবং সেই প্রান্তের ইউরেনিয়াম বুলেটকে উচ্চগতিতে ব্যারেলের অপর প্রান্তে থাকা ইউরেনিয়াম কোরের দিকে ঠেলে দেয়। ইউরেনিয়াম বুলেট ও ইউরেনিয়াম কোর মিলিত হয়ে সুপার-ক্রিটিক্যাল ভরের ইউরেনিয়াম কোর তৈরি হয়। তখন কোরের সাথে থাকা Chain Reaction Initiator উক্ত কোরে নিউট্রন নিক্ষেপ করে চেইন রিএ্যাকশন শুরু করে দেয়। সুপার ক্রিটিক্যাল ভর বিশিষ্ট হওয়ায় শুরু হওয়া চেইন রিএ্যাকশন চলতে থাকে এবং বাড়তে থাকে। এই ইউরেনিয়াম কোর চারদিক থেকে নিউট্রন রিফ্লেক্টর দিয়ে ঘেরা থাকে। ফলে ফিশন থেকে সৃষ্ট নিউট্রন, রিফ্লেক্টরে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে ও চেইন রিএ্যাকশনে অংশ নেয় যাতে ফিশন আরো দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে। এই ফিশন চেইন রিএ্যাকশনের ফলে সৃষ্ট বিপুল শক্তি বিস্ফোরণের মাধ্যমে তাপ, আলোক শক্তির ধ্বংসাত্মক রূপে দেখা দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় আঘাত হানে পারমাণবিক বোমা Little Boy যা ছিল Gun Type Atomic Bomb. গান টাইপ এক্সপ্লোসিভ এর শক্তি ও দক্ষতা কম হওয়ায় বর্তমানে বড় ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রে এটা ব্যবহৃত হয় না। সেগুলোতে ইমপ্লোশন টাইপ এক্সপ্লোসিভ ব্যবহৃত হয়।

‘ইমপ্লোশন টাইপ’ পারমাণবিক বোমার ‘সেকশন ভিউ’
ইমপ্লোশন টাইপ বিস্ফোরকের দক্ষতা বেশি হওয়ায় এটি বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে। বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রে এই ধরণের বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়। ইমপ্লোশন টাইপ বিস্ফোরকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ হিসেবে প্লুটোনিয়াম২৩৯ ব্যবহৃত হয় যা ইউরেনিয়ামের চেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক শক্তি উৎপাদনে সক্ষম।

ইমপ্লোশন টাইপ বিস্ফোরকে প্লুটোনিয়ামের বদলে ইউরেনিয়াম২৩৫ ব্যবহার করা যেতে পারে যেখানে গান টাইপ বিস্ফোরকে প্লুটোনিয়াম ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। বেশি শক্তিশালী ও দক্ষতা সম্পন্ন হবার কারণে এর গঠন এবং বিস্ফোরণ প্রক্রিয়াও গান টাইপ বিস্ফোরকের চেয়ে জটিল।

ইমপ্লোশন টাইপ বিস্ফোরকের গঠন


ইমপ্লোশন টাইপ ফিশন বোমার অভ্যন্তরীণ গঠন
এধরনের বিস্ফোরকের কেন্দ্রে থাকে Neutron Initiator যা যথাসময়ে নিউট্রন ছুড়ে দিয়ে মূল ফিশন বিক্রিয়া শুরু করে। এই Initiator এর চারদিকে গোলক আকৃতিতে থাকে প্রধান নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোসিভ চার্জ বা প্লুটোনিয়ামের গোলক। এই গোলক এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এর আকার-আকৃতি ও আয়তন এর সাপেক্ষে এর ভর সাব-ক্রিটিক্যাল ভরে থাকে, যেখানে পারমাণবিক বিক্রিয়া স্থায়ী হবে না। মূল চার্জের চারিদিকে তুলনামূলক পাতলা স্তরে থাকে ইউরেনিয়াম যাকে টেম্পার বলা হয়। টেম্পারের বাইরে বসানো হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রাসায়নিক বিস্ফোরক। আর এই পুরো এসেম্বলি একটি ধাতব বাক্স বা কেসিং এর ভেতর থাকে।

ইমপ্লোশন টাইপ বিস্ফোরকের কার্যপ্রণালী

implosion_bomb-working
বিস্ফোরণ প্রক্রিয়া GIF animation আকারে দেখতে ইমেজে ক্লিক করুন
বিস্ফোরণ ঘটানোর মুল প্রক্রিয়া শুরু হয় বাইরের স্তরের রাসায়নিক বিস্ফোরক এর বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। প্রথমে এই বাইরের স্তরের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাসায়নিক বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই বিস্ফোরণের ধাক্কা ও শকওয়েভ অভ্যন্তরস্থ ইউরেনিয়াম টেম্পার ও প্লুটোনিয়াম কোরের উপর উচ্চচাপের সৃষ্টি করে। ফলে অভ্যন্তরস্থ মূল প্লুটোনিয়াম চার্জ সংকুচিত হয়ে আয়তনে কমে যায়, কিন্তু ভর একই থাকে। এতে ফায়ারিং এর পূর্বে যে চার্জ কোর সাব-ক্রিটিক্যাল ভর বিশিষ্ট ছিল আয়তন কমে যাবার ফলে একই ভর বিশিষ্ট সংকুচিত চার্জ গোলক তখন হয়ে ওঠে সুপার-ক্রিটিক্যাল ভরের নিউক্লিয়ার চার্জ। এই সময় প্লুটোনিয়াম কোরের কেন্দ্রে থাকা Neutron Initiator নিউট্রন ছুড়ে দিয়ে সুপার ক্রিটিক্যাল প্লুটোনিয়াম কোরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করে।

এই ফিশন বিক্রিয়া পুরো চার্জে সংগঠিত হয় এবং বিপুল শক্তিতে বিস্ফোরিত হয় ইমপ্লোশন টাইপ পারমাণবিক বিস্ফোরক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাগাসাকিতে আঘাত হানে পারমাণবিক বোমা Fat Man যা ছিল Implosion Type Atomic Bomb.


এই হল মূলত পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে তৈরি পারমাণবিক বিস্ফোরক। এই বিস্ফোরকগুলোর আকার, আয়তন, বিস্ফোরণ মাত্রা এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তাপ-পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় কম।

তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র (Thermo-Nuclear Weapon)
পারমাণবিক বিস্ফোরক বিষয়ক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণার ফলে আবিষ্কৃত আরো উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক বিস্ফোরকগুলো হল ফিউশন বিস্ফোরক। পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়া যেটা মূলত সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের কেন্দ্রে হয়ে থাকে সে বিক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে ফিশন বিস্ফোরকের চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী পারমাণবিক বিস্ফোরক তৈরি করা যায় যেগুলো পারমাণবিক ফিউশন বিস্ফোরক, প্রচলিত শব্দে ‘হাইড্রোজেন বোমা’ বা ‘H-Bomb’. ফিউশন বিস্ফোরক এর একটি হচ্ছে ‘হাইড্রোজেন বোমা’ তবে এর আরো রকমফের রয়েছে।

ফিউশন বিক্রিয়ার আরেক নাম তাপ-পারমাণবিক বিক্রিয়া। তাই ফিউশন বিস্ফোরক জাতীয় পারমাণবিক অস্ত্রসমূহকে (Thermo-Nuclear Weapon) তাপ-পারমানবিক অস্ত্রও বলা হয়ে থাকে। তাপ-পারমাণবিক বিস্ফোরক মূলত ফিশন ও ফিউশন বিস্ফোরকের সমন্বয়ে গঠিত অত্যধিক শক্তিশালী বিস্ফোরক, যার বিস্ফোরণের মাত্রা ফিশন পারমাণবিক বিস্ফোরক এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

তাপ-পারমাণবিক বিস্ফোরকের শক্তি ও রেঞ্জ অনেক বেশি হওয়ায় এগুলো বর্তমানে যুদ্ধবিমানে বহনযোগ্য বোমা আকারের পাশাপাশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে নিক্ষেপ উপযোগী করে তৈরি করা হয়, যাদের আমরা পারমাণবিক মিসাইল, নিউক্লিয়ার ব্যালাস্টিক মিসাইল, নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড (Nulcear Missile, Ballistic Missile, Nuclear Warhead) ইত্যাদি নামে জানি।

পারমাণবিক ফিশন বিস্ফোরকের মূল বিস্ফোরক উপাদান যেমন ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়াম; ফিউশন বিস্ফোরকের মূল বিস্ফোরক উপাদান হল হাইড্রোজেন এবং হাইড্রোজেনের ভারী আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম। এজন্য ফিউশন বিস্ফোরক বা তাপ-পারমাণবিক বিস্ফোরককে হাইড্রোজেন বিস্ফোরক বলা হয়ে থাকে।

তাপ-পারমাণবিক বিস্ফোরকের মূলনীতি, গঠন ও কার্যপ্রণালী

তাপ-পারমাণবিক বিস্ফোরক মূলত ফিশন এবং ফিউশন বিস্ফোরকের সম্মিলিত একটি বিস্ফোরক অবস্থা। হাইড্রোজেনে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু করতে অতি উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রী সেলসিয়াস তা মুহূর্তের মধ্যে অন্য কোনোভাবেই উৎপন্ন করা সম্ভব নয়; কোনো না কোনো পারমাণবিক বিক্রিয়া ছাড়া। তাই ফিউশন বিস্ফোরকের মূল বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের সূচনা ঘটাতে প্রয়োজন হয় আরেকটি ফিশন বিস্ফোরক।

থার্মো নিউক্লিয়ার বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ধাপসমূহ
তাপ-পারমাণবিক বিস্ফোরকের দুটি বিস্ফোরক অংশ থাকে একটি প্রাইমারি ফিশন বিস্ফোরক এবং অপরটি সেকেন্ডারি মূল ফিউশন বিস্ফোরক অংশ। প্রাইমারি ফিশন বিস্ফোরকটি মূলত এক প্রকার ইমপ্লোশন টাইপ ফিশন বিস্ফোরক। এটির বিস্ফোরণ মূল সেকেন্ডারি ফিউশন বিস্ফোরকে বিস্ফোরণের ট্রিগার হিসাবে কাজ করে। উৎপন্ন করে হাইড্রোজেন আইসোটোপে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হবার মত তাপমাত্রা। সেকেন্ডারি ফিউশন বিস্ফোরকের বাইরের স্তরে থাকে ফিশনেবল ইউরেনিয়াম টেম্পার এবং ভেতরে কেন্দ্রে থাকে ফিশনেবল ইউরেনিয়াম অথবা প্লুটোনিয়াম স্পার্ক প্লাগ। এই দুই স্তরের মাঝে থাকে তরল হাইড্রোজেন আইসোটোপ যা তাপ-পারমাণবিক অস্ত্রের মূল ফিউশন জ্বালানী (Fusion Fuel) রূপে কাজ করে।

প্রাইমারি ফিশন বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট উচ্চতাপ, X-Ray এবং Gama Radiation সেকেন্ডারি বিস্ফোরকের বাইরের ইউরেনিয়াম টেম্পারে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করে যা ফিউশন ফুয়েলের বাইরের দিক উত্তপ্ত করে তোলে। এই সময় ভেতরের ফিশনেবল ইউরেনিয়াম স্পার্ক প্লাগ এ ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা হয় যা ফিউশন ফুয়েলের ভেতরের দিকেও উত্তপ্ত করে তোলে। এভাবে চারদিক থেকে ফিশন বিক্রিয়ায় সৃষ্ট অতি উচ্চ তাপ নূন্যতম সময়ের মধ্যে সেকেন্ডারি বিস্ফোরকে থাকা হাইড্রোজেন এর তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায়। এতে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ, মূল ফিউশন ফুয়েল জ্বলে ওঠে ও শুরু হয় হাইড্রোজেনের ফিউশন বিক্রিয়া। হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ফিউশনিত হয়ে তৈরি করে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস এবং সেই সাথে নিঃসৃত করে বৃহৎ পরিমাণে শক্তি।

ফিউশন বিক্রিয়ায় সৃষ্ট অবিশ্বাস্য শক্তি তাপ, রেডিয়েশন, শক ওয়েভ ইত্যাদি আকারে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হয় এবং সৃষ্টি করে এক বিপুল ধ্বংসলীলা।

Thermo-Nuclear WarHead – ফিউশন মিসাইল
প্রাইমারি ফিশন বিস্ফোরক এখানে মূল ফিউশন বিস্ফোরকের ট্রিগার হিসেবে কাজ করছে মাত্র; অথচ এটি নিজে একাই একটি বিশাল পারমাণবিক অস্ত্র হিসাবে কাজ করতে সক্ষম। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র কত বেশি শক্তিশালী, ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক হতে পারে!



suitcase-nuke
হাতে বহনযোগ্য ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিস্ফোরক
সুটকেস নিউক আসলে খুবই ছোট আকৃতির পারমাণবিক অস্ত্র। তবে এটিও বিস্ফোরক পর্যায়েরই আওতাভুক্ত। সুটকেস নিউক কে WMD (Weapon of Mass Destruction) এর মধ্যে গণ্য করা হয় না। একে বলা হয় ADM বা Atomic Demolition Munition. ধারণা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়ন কোল্ড ওয়ার এর সময় এই প্রযুক্তির উদ্ভব ঘটে এবং সুটকেস নিউক সহ এমন আরো পোর্টেবল নিউক্লিয়ার ডিভাইস হয়ত পরীক্ষাধীন রয়েছে।

সুটকেস নিউক ২৪×১২×১০ ইঞ্চি একটি বহনযোগ্য বাক্স আকারে প্রস্তুত করা হয় যার ভর ৫০ পাউন্ডের বেশি হবে না। এটি তৈরির জন্য সবচেয়ে ভাল বিস্ফোরক উপাদান হল প্লুটোনিয়াম। কারণ নূন্যতম ২২ পাউন্ড প্লুটোনিয়াম হলেই তাতে পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়া ঘটানো ও চেইন রিএ্যাকশন স্থায়ী করা সম্ভব। অল্প শক্তির বিধায় এটি সাধারণত Gun Type বিস্ফোরক হয়ে থাকে।


বিশাল পরিসরে এর ধ্বংসক্ষমতা না থাকলেও অল্পপরিসরে বিস্তৃত ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড চালাতে এর পারদর্শিতা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। এ কারণে অবৈধভাবে পাচার হয়ে অথবা অন্য কোনোভাবে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে গেলে পোর্টেবল নিউক্লিয়ার ডিভাইস অন্যতম একটি ভয়ের কারণ হয়ে উঠবে।

ডার্টি বম্ব (Dirty Bomb)
এটিকে আসলে মূলধারার পারমাণবিক অস্ত্রের পর্যায়ে ধরা যায় না, কারণ এখানে পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট শক্তি বিস্ফোরণের জন্য কাজ করে না। আর এজন্যই হয়ত এর এই অদ্ভুত নামকরণ। এটি এক প্রকার Radiological dispersion devices (RDD).

Dirty Bomb Fusion
কোনো সাধারণ রাসায়নিক বিস্ফোরকে যদি ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের মত তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশিয়ে দেয়া হয় তখন সেই বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ফলে সেটার স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরে অতিরিক্ত যে ঘটনাটা ঘটে তা হল বিস্ফোরণ-আক্রান্ত অঞ্চল ও বস্তুতে তেজস্ক্রিয় দূষণ। বিস্ফোরণ অঞ্চল ও বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ ও বস্তুতে তেজস্ক্রিয় দূষণ দেখা দেয়। আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষ বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পরে। তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত বস্তু থেকেও অল্প মাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত হয় যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

এভাবে সাধারণ বিস্ফোরক অস্ত্রের সাথে তেজস্ক্রিয়তার মিশেলে তৈরি হয় ‘ডার্টি বম্ব’। এটির প্রস্তুতপ্রণালী অন্য যে কোন পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় একবারেই সহজ। তেজস্ক্রিয় পদার্থ সংশ্লিষ্ট যে কোন ব্যক্তি এই ধরণের অস্ত্র তৈরি করতে পারে। এ অস্ত্র ব্যবহারের মূল কারণ বৃহৎ পরিসরে ক্ষতি সাধন করা নয়, বরং সাধারণ বিস্ফোরণের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে দেয়াই এর উদ্দেশ্য।

এই হলো প্রধান ও মূলধারার পারমাণবিক অস্ত্রের ধরন ও গঠন পরিচিতি। পরবর্তী পর্বে এসব অস্ত্রের বিস্ফোরণ মাত্রা, ধ্বংসলীলার সীমা, সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াও পারমাণবিক অস্ত্র কিভাবে বৈশ্বিক রাজনীতি ও মানবসভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

-চলমানঃ ৫/১ম পর্ব


তথ্যসূত্রঃ 
১. Nuclear Energy: Principles, Practices and Prospects – Second Edition by David Bodansky (Book)
২. Nuclear Energy: An Introduction to the Concepts, Systems and Applications of Nuclear Processes – Sixth Edition by Raymond L. Murray (Book)
৬. ABC News